
গাজী আবু বকর : তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সেবা পৌঁছে দিতে এবং মাঠ প্রশাসনের কাজে গতিশীলতা আনতে আজ রোববার (৩ মে) থেকে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের প্রশাসনিক মিলনমেলা, যেখানে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসবেন দেশের ৬৪ জেলার ডিসি ও ৮ জন বিভাগীয় কমিশনার। আগামীকাল সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. নাসিমুল গনি জানান, এবারের সম্মেলনে মোট ৩৪টি কার্য-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কেবল সরকারপ্রধানের সঙ্গেই নন, বরং রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবেন। এ ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পৃথক অধিবেশনে অংশ নেবেন তারা, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
এবারের সম্মেলনের মূল আকর্ষণ হলো মাঠ পর্যায় থেকে আসা একগুচ্ছ উদ্ভাবনী ও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সুশাসনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে; গাজীপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করে বিক্ষিপ্ত শিল্প-কারখানা এক জায়গায় সরিয়ে নেওয়া, রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল চালু করা এবং দেশের সব দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করা। এমনকি কওমি মাদ্রাসাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে হাঁটার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকরা রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে ডিজিটাল লেনদেন (পজ মেশিন বা ব্যাংকিং চ্যানেল) বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন। বিশেষ করে চিকিৎসক, আইনজীবী ও পাসপোর্ট অফিসের মতো খাতগুলোতে নগদ অর্থ লেনদেন কমিয়ে স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব রোধে জেলা পর্যায়ে ‘ফ্যাক্ট চেকিং সেন্টার’ স্থাপন এবং কুরুচিপূর্ণ ওয়েবসাইটগুলো বন্ধের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নেও এসেছে বড় বড় সব পরিকল্পনা। নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ এবং সিলেট-ওসমানী বিমানবন্দর সড়কে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাবনাগুলো সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে। প্রান্তিক মানুষের সেবায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন, মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরি স্থায়ীকরণ এবং পার্বত্য অঞ্চলে শতভাগ বিদ্যুতায়নের মতো বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট রিসাইলেন্স ফান্ড’ গঠন থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষায় ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহারের প্রস্তাব—সব মিলিয়ে এবারের ডিসি সম্মেলন কেবল একটি প্রশাসনিক বৈঠক নয়, বরং দেশের আগামীর উন্নয়নের একটি সামগ্রিক রূপরেখা। ৪ মে থেকে ৬ মে পর্যন্ত চলা এই নিবিড় আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার নতুন কৌশল।
