
বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে গত দুই মাসে একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। প্রবীণ রাজনীতিক প্রথমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আলোচনায় আসেন। পরে দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাঁকে বহিষ্কার করে। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যেই তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু নতুন করে তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার এজাহারে গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে মরিয়মকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। গাজী নজরুলকে এই মামলায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদে এসেছিলেন গাজী নজরুল। ছয় মাসের মধ্যেই নানা বিতর্ক, সমালোচনা আর ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন তিনি।
জুলাইয়ের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। শুরুতে জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই জানান, ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তিনি দাবি করেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন।
এরপরও বিষয়টি থামেনি। জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। ২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুলকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দল জানায়, তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। পরে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানায় জামায়াত।
দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ তখনই বাতিল হয়নি। তিনি নিজেও বলেছিলেন, তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বহাল আছেন। জামায়াতের নেতারা অবশ্য তাঁকে আর দলের সদস্য হিসেবে স্বীকার করেননি।
এরপর সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটিতেও তাঁর নাম রাখা নিয়ে বিতর্কের পর নাম বাদ দেওয়া হয়।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী শুধু কোনো রাজনৈতিক দল একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন সরাসরি বিধান নেই। এই বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত দেন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারেন স্পিকার। তবে এই বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
এই অবস্থায় দলীয় রাজনীতিতে তাঁর জায়গা সংকুচিত হতে থাকে। জামায়াতের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, তাঁকে পদত্যাগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। তিনি বরং দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
অতঃপর মরিয়মের মৃত্যু
গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ন্যাম ভবনগুলো সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনেকেই পরিবার নিয়ে সেখানে থাকেন।
রাতে মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং ওবায়দুর রহমানকে মামলায় আসামি করা হয়। প্রথমে গাজী নজরুল এবং তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। পরে রাতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।
মরিয়মের বাবার করা এজাহারে গত কয়েক মাসের সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনের একটি ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়েতে ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ছিল। বিয়ের পর মরিয়ম তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা বলতেন—এমন অভিযোগও করা হয়েছে । পরিবারকে মুঠোফোনে তিনি এসব কথা জানিয়েছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টা
এজাহারে মরিয়মের মৃত্যুর সম্ভাব্য সময়ও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো একসময় ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসুম বিল্লাহ সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করা হয়। ঘরের ভেতর একটি আত্মহত্যার নোটও পাওয়া যায়। সেখানে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং কাছের মানুষের কারণে বিপর্যস্ত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে বলে এজাহারে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে লেখাটি মরিয়মেরই কি না, তা এখনো ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
একটি ভিডিও থেকে আরেক ঘটনায়
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে গাজী নজরুলের ঘটনাপ্রবাহ যেন একে অন্যের সঙ্গে এসে মিশেছে। জুনে দ্বিতীয় বিয়ে, জুলাইয়ে সেই সম্পর্কের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ, এরপর জামায়াত থেকে বহিষ্কার ও সংসদ সদস্য পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এরপর সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা ।
একজন তিনবারের সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন, দলীয় বহিষ্কার এবং এখন ফৌজদারি মামলায় আসামি হওয়া—গত কয়েক মাসে গাজী নজরুল ইসলামের অবস্থানের যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তার শেষ কোথায়, সেটিই এখন সামনে থাকা প্রশ্ন ।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার এজাহারে গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে মরিয়মকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
কঠিন সময়ে জামায়াতের প্রার্থী
গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য । সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সময়ে জামায়াতের হয়ে তাঁর সংসদে যাওয়া ছিল দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু সংসদে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। শুরুতে জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই জানান, ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তিনি দাবি করেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। ২২ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুলকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দল জানায়, তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। পরে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানানো হয়।
এই ঘটনার প্রায় দুই মাস পর, ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথম দিকে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা নাকি হত্যা, তা নিশ্চিত করেনি। পরে মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং ওবায়দুর রহমানকে মামলায় আসামি করা হয়।
মরিয়মের বাবার করা এজাহারে গত কয়েক মাসের সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনের একটি ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এজাহার অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়ম বেগমের বিয়ে হয় গত ১৭ জুন ঢাকায়, মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর বাসায়। বিয়েটি পারিবারিকভাবে এবং গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের সম্মতিতে হয়েছে বলে আগে গাজী নজরুল নিজেও জানিয়েছিলেন। তবে বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো বলে তাঁর বাবার অভিযোগ। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের কাছে এসব অভিযোগ করেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের ক্ষেত্রে তাঁর মামা ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। মরিয়মের পরিবারের অভিযোগ, গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা এবং ওবায়দুরের আচরণ ও বিভিন্ন ঘটনার কারণে মরিয়ম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
ঘটনার দিন ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো একসময় মরিয়মের মৃত্যু হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। মাসুম বিল্লাহ সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি কথিত আত্মহত্যার নোট পাওয়া যায়। এতে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও কাছের মানুষের কারণে হতাশ হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে বলে বাদী উল্লেখ করেছেন। তবে লেখাটি মরিয়মের নিজের কি না, তা এখন ফরেনসিক পরীক্ষার বিষয়।
মরিয়মের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অধিকাংশ মানুষ মরিয়মকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য গাজী নজরুল ও তাঁর পরিবারের দিকে তির ছোড়েন।
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে গাজী নজরুলের ঘটনাপ্রবাহ ব্যক্তি, পারিবারিক জীবন ও সমাজকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। একজন তিনবারের সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন, দলীয় বহিষ্কার এবং এখন ফৌজদারি মামলায় আসামি হওয়া—গত কয়েক মাসে গাজী নজরুল ইসলামের অবস্থানের যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার শেষ কোথায়, সেটিই এখন প্রশ্ন।
