এখন দরকার চলনসই গণতন্ত্র: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : নিখুঁত একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অপেক্ষায় না থেকে দেশে আপাতত ‘চলনসই’ একটি কাঠামো গড়ে তোলার কথা বললেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তাঁর মতে, তা গড়ে তুলতে পারলেই দেশের মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে।

আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় নিজের এই মত তুলে ধরেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ আয়োজিত এই আলোচনায় তিনি সম্মানিত অতিথি হয়ে বক্তব্য দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের আগে একাধিকবার নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন।

সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে চলনসই গণতন্ত্রের কাঠামো কেমন হবে, তার ব্যাখ্যাও দেন তিনি।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো…অন্তত কার্যকর থাকতে হবে এবং জবাবদিহির জায়গা, পার্লামেন্ট (সংসদ) ছাড়া যে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ—এদের মতপ্রকাশে কিছুটা অন্তত স্বাধীনতা থাকতে হবে।’

আবার একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট বলে মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, এ জন্য প্রয়োজন জবাবদিহি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক ভিত্তি।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও প্রশাসনের মধ্যে ন্যূনতম সততা ও জবাবদিহি না থাকলে গণতন্ত্র দ্রুতই দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সামাজিক আস্থা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মূল্যবোধ, যা তিনি সামাজিক মূলধন হিসেবে দেখেন, তা গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হলেও জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন করে তা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। তাহলেই দেশের সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তাদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন পথ তৈরি করা সম্ভবপর হবে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের মতো সমাজে গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বুঝতে হলে পশ্চিমা তত্ত্বের বাইরে নিজেদের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, সামাজিক বিজ্ঞান কখনোই পুরোপুরি সর্বজনীন নয়, এটি প্রেক্ষিতনির্ভর। সে জন্য দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধানে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে গবেষণা ও নীতি নির্ধারণ জরুরি।

গণতন্ত্রের সঙ্গে অর্থনীতির নিগূঢ় সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অজুহাতে দীর্ঘ সময় কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকে থাকলেও একপর্যায়ে জবাবদিহির অভাব, ‘ক্রোনি পুঁজিবাদ’ (ব্যবসায়ী–সরকার যোগসাজশে পরিচালিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

তাঁর মতে, গণতন্ত্রকে নিজের স্বাভাবিক গতিতে চলতে না দিলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিপীড়নমূলক ও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকেও সংকটে ফেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

‘পুরোনো ব্যবস্থার পুনরুৎপাদনই বেশি’
আলোচনা সভায় আরেক সম্মানিত অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে আগে দেখতে হবে আদৌ এখানে গণতন্ত্র কখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কি না।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট কেবল রাজনৈতিক অধিকারের সংকট নয়; এটি সামাজিক কাঠামোর সংকটও। একটি শক্তিশালী ও দায়বদ্ধ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে না ওঠায় দেশে বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে, আবার সেই সংগ্রাম বারবার বাধাগ্রস্তও হচ্ছে।

স্বাধীনতার পরও কাঙ্ক্ষিত সামাজিক পরিবর্তন না হওয়ায় পুরোনো ব্যবস্থার ‘পুনরুৎপাদনই’ বেশি হয়েছে, এমন মন্তব্যও করেন মাহবুব উল্লাহ।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ–অভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, জ্ঞানচর্চার মূল শক্তি কেবল অর্থ নয়; বরং প্রশ্ন তোলা, তর্কবিতর্ক ও চিন্তার স্বাধীন পরিবেশ। তাঁর মতে, বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য ব্যক্তিগত সাধনা ও সহকর্মীদের মধ্যে বৌদ্ধিক বিনিময়ের সংস্কৃতি অপরিহার্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই গবেষণাবান্ধব পরিবেশ দুর্বল হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই উচ্চশিক্ষালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অগ্রভাগে ছিলেন; মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ক্ষতও বহন করেছে এই প্রতিষ্ঠান। এবার নানা আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হচ্ছে।

Share