কাস্টমস সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে জাল নথিতে মদ-সিগারেট খালাস প্রচেষ্টা

বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার ‘সাইবার অপারেটর’

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমসের ডিজিটাল শুল্ক ব্যবস্থায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বিদেশি মদ ও সিগারেট খালাস এবং প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কাস্টমসের সাইবার নিরাপত্তা। এ ঘটনায় প্রযুক্তিগত সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত শেখ সেজান (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পুলিশ বলছে, তিনি নেপালে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

সিএমপি সূত্র জানায়, গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয়। শুক্রবার চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর থানায় দায়ের হওয়া দুটি মামলার তদন্তে শেখ সেজানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এরপরই তার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। এর আগে নড়াইলের লোহাগড়ায় তার বাড়িতে অভিযান চালানো হলেও তিনি পালিয়ে যান। পরে বিমানবন্দর দিয়ে দেশত্যাগের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ চক্র চীন থেকে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত ফেব্রিক্স আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঘোষণার আড়ালে একটি কন্টেইনারে ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার বিদেশি মদ এবং আরেকটি কন্টেইনারে ৫০ লাখ শলাকা বিদেশি সিগারেট দেশে আনা হয়। এরপর ভুয়া এলসি, জাল কাস্টমস নথি এবং ভুয়া অনুমোদনের মাধ্যমে এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে চালান খালাসের চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনলাইন পোর্টালেও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এতে সরকারের অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ২০ মে একটি মোবাইল অপারেটরের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে কাস্টমসের এক কর্মকর্তার ইউজার আইডিতে অননুমোদিতভাবে লগইন করা হয়। পরে একই আইডি ব্যবহার করে সিগারেট আমদানির এলসি নিবন্ধন ও সক্রিয় করার কাজ সম্পন্ন করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শেখ সেজান স্বীকার করেছেন, তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্যের ইউজার আইডি ব্যবহার, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং জাল কাস্টমস কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছেন। একই তথ্য এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামি আশরাফ হোসেন ওরফে রাজুর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতেও উঠে এসেছে।

পুলিশের তথ্যমতে, শেখ সেজানের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় সাইবার অপরাধ ও প্রতারণার অভিযোগে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। এর আগে সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট ক্লোনিং, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ভ‚মি উন্নয়ন করের রসিদ, টিকা সনদসহ নানা সরকারি ডিজিটাল সেবা জালিয়াতির অভিযোগে তিনি সিএমপি ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ও তার সহযোগীরা সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করতেন।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান হাফেজ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মামুন, পরিচালক বাকির হোসেন, প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত শুল্কায়ন ও কাস্টমস কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

সা¤প্রতিক সময়ে কাস্টমসের ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও সুরক্ষিত করতে এনবিআর একটি সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (SOC) চালু করেছে। এই কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা কাস্টমসের সাইবার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য হামলা শনাক্ত এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ করছে। তবে সর্বশেষ এই ঘটনায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারী পরিচয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

Share