
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে বন্যার পানি নামার পর বাড়ছে পানিবাহিত রোগ ও সাপের কামড়ের প্রকোপ। গ্রামগুলোতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর উপচে পড়া ভিড়ের কথা জানা গেছে।
গত ৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া স্বল্পমেয়াদি বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা টানা ৭ দিন ধরে প্লাবিত হয়। পানিতে ডুবে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পানি কমতে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপদ পানির সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা সাতকানিয়ায় বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি বেশ গুরুতর আঁকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় ৩০০ জনের বেশি রোগী পানিবাহিত রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন।
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, ‘গত দুদিন ধরে আমার ছোট মেয়ে ডায়রিয়ায় ভুগছে। আর আমার স্ত্রী চর্মরোগে ভুগছেন।’
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অমিত দে বলেন, ‘বন্যার সময় হাসপাতালের নিচতলা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। পানি নামার পর বহির্বিভাগের সেবা আবার চালু হয়েছে।’
‘গত ৪৮ ঘণ্টায় ৩০০ জনের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি। তাদের বেশিরভাগই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুপেয় পানির সংকট বেড়েছে। এতে কলেরা, ডায়রিয়া ও চর্মরোগ আরও বাড়তে পারে বলে আমরা ধারণা করছি,’ বলেন তিনি।
মেডিকেল টিমগুলো দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাঁশখালীতেও অনেক রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। উপজেলার কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘আমাদের গ্রামের সব টিউবওয়েল দূষিত হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে মানুষ নোংরা পানি পান করছে।’
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজমা আক্তার বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে আসা রোগীদের ৩০ শতাংশের বেশি ডায়রিয়ায় ভুগছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকটে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তবে আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।’
বন্যায় উপজেলার ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতেও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্কতাবস্থায় রয়েছে।
পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ রোগী ভূমিধসে আহত বা সাপের কামড়ের শিকার। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বন্যার পানি নামতে শুরু করলেই ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগ বেড়ে যায়। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
পার্বত্য অঞ্চলের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংক্রামক চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণত বন্যার পর চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার তীব্র প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এখনো ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা না গেলেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খোসপাঁচড়াসহ অন্যান্য চর্মরোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আমাদের মোবাইল মেডিকেল টিমগুলো চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল প্রস্তুত রেখেছি।’
বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার অগভীর নলকূপ দূষিত হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৪ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করেছে।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত ৫ জেলায় এখন পর্যন্ত ১২৬ জনকে সাপে কেটেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ১১২টি চট্টগ্রামে ও ১৪টি কক্সবাজারে।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে বোয়ালখালী উপজেলায় ২৬টি, এরপর বাঁশখালীতে ১৯টি ও পটিয়ায় ১৮টি।
এ তথ্য নিশ্চিত করে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সাপের কামড়ে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। সময়মতো চিকিৎসা দিতে আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১ হাজার ১০০ ভায়াল অ্যান্টি-ভেনম বিতরণ করেছি।’
সংকট মোকাবিলায় সরকার ৫ জেলার বন্যাদুর্গত এলাকায় ৫১৬টি মেডিকেল টিম পরিচালনা করছে। দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকার অন্য মোবাইল মেডিকেল ইউনিট প্রস্তুত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত আছে। আমাদের মেডিকেল টিমগুলো মাঠে সক্রিয় আছে। আগেই প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত করেছিলাম। এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের মজুত রয়েছে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুর রব বলেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষকে অবশ্যই পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। সাপে কামড় দিলে বা পানিবাহিত রোগের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে।’
‘এ সময়ে এসে শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বাদের যেন অযত্ন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন,’ যোগ করেন তিনি।
