কুপ্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে চুরির অভিযোগে তরুণীকে গাছে বেঁধে মারধর

জুতার মালা পরিয়ে কাটা হলো চুল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি : শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে কুপ্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে চুরির অভিযোগ তুলে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর, গলায় জুতার মালা পরানো ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ সময় তাঁর ১২ বছর বয়সী ছোট বোনকেও একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।

গত মঙ্গলবার ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার তরুণীর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

শুক্রবার রাতে পরিবারের অভিযোগের পর করা মামলায় আজ শনিবার ভোরে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন আফসানা বেগম ও আমির। তাঁরাসহ এ মামলায় মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তরুণীকে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় কয়েকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। কয়েকজন নারী তাঁর চুল কাটছেন এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিচ্ছেন। পাশে একটি খুঁটির সঙ্গে তাঁর ছোট বোনকেও বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।

ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদপুরে নদীভাঙনে গৃহহীন হওয়ায় পরিবারটি ভেদরগঞ্জে চলে আসে। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রায় তিন মাস আগে তাঁরা উপজেলার একটি গ্রামে ভাড়া বাড়িতে ওঠেন। বাড়ির পাশের মুদিদোকানের মালিক মনির হোসেন মোল্যা প্রায়ই ওই তরুণীকে উত্ত্যক্ত করতেন এবং কুপ্রস্তাব দিতেন।

একপর্যায়ে মনির হোসেন, বাড়ির মালিক ফৌজিয়া সরদার, তাঁর আত্মীয় নিশি আক্তার ও আফসানা বেগম ওই তরুণী ও তাঁর ছোট বোনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন বলে অভিযোগ। তরুণীর গলায় জুতার মালা পরানো হয় এবং তাঁর মাথার কিছু চুল কেটে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে সখিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।

মঙ্গলবার সকালে ওই তরুণী তাঁর ১২ বছর বয়সী বোন ও আট বছর বয়সী ভাইকে নিয়ে মনিরের দোকানে যান। পরিবারের ভাষ্য, সেখানে মনির তরুণীকে কুপ্রস্তাব দেন। বিষয়টি মা–বাবাকে জানাবেন বলে তরুণী তাঁকে সতর্ক করেন। এরপর চুরির অভিযোগ তুলে তিন ভাই–বোনকে পাশের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যানটিনে আটকে রাখা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। পরে তাঁদের ভাড়া বাসার মালিকের একটি ঘরেও আটকে রাখা হয়।

একপর্যায়ে মনির হোসেন, বাড়ির মালিক ফৌজিয়া সরদার, তাঁর আত্মীয় নিশি আক্তার ও আফসানা বেগম ওই তরুণী ও তাঁর ছোট বোনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন বলে অভিযোগ। তরুণীর গলায় জুতার মালা পরানো হয় এবং তাঁর মাথার কিছু চুল কেটে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে সখিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।

‘জীবন ও সম্মান বাঁচাতে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছি’

ভুক্তভোগী তরুণীর মা বলেন, মঙ্গলবার রাতে তিনি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ আটক করলেও গভীর রাতে মনিরকে ছেড়ে দেয়। এরপর পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানো হলে তাঁরা এলাকা ছেড়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে আশ্রয় নেন। পরে গতকাল রাতে মনির হোসেনকে প্রধান আসামি করে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

তরুণীর মায়ের ভাষ্য, ‘প্রতিবাদ করায় মেয়েকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্য আমরা অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছি।’ তরুণীর ভাষ্য, মঙ্গলবার চাল, ডাল ও তেল কিনতে গেলে মনির তাঁকে একটি কোমল পানীয় খেতে দেন এবং কুপ্রস্তাব দেন। এর প্রতিবাদ করায় তাঁকে পাশের একটি ক্যানটিনে আটকে রাখা হয়। পরে কয়েকজন তাঁকে ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে ফৌজিয়া সরদার ও তাঁর দুই আত্মীয় তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন এবং চুল কেটে দেন। কান্নাকাটি করে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তাঁকে ছাড়া হয়নি। পরে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে।

ওই তরুণী তাঁর দোকান থেকে কিছু মালামাল চুরি করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে পাশের একটি ক্যানটিনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়। বাড়ির মালিক বকেয়া ভাড়ার টাকা আদায়ের জন্য ওই তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনির হোসেন। মামলার আগে তিনি এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন। ওই সময় তিনি বলেন, তিনি ওই তরুণীকে কখনো উত্ত্যক্ত করেননি। তাঁর দাবি, তরুণী তাঁর দোকান থেকে কিছু মালামাল চুরি করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে পাশের একটি ক্যানটিনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

মনিরের ভাষ্য, পরে বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হয়। বাড়ির মালিক বকেয়া ভাড়ার টাকা আদায়ের জন্য ওই তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করেন। মঙ্গলবার তাঁকে পুলিশ আটক করেছিল এবং পরে স্থানীয় মুরব্বিরা থানা থেকে ছাড়িয়ে নেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল ছৈয়ালকান্দি এলাকায় ফৌজিয়া সরদারের বাড়ি গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকেরা এলাকায় এসেছেন, এমন খবর পেয়ে তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী বাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানান স্থানীয় লোকজন। এ ছাড়া মনিরেরও খোঁজ মিলছে না।

সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, তরুণীকে নির্যাতনের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাঁকে উদ্ধারের পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। প্রথম দিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা মামলা করতে আগ্রহী ছিলেন না। পরে তাঁরা মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Share