জুলাই অভ্যুত্থানে স্নাইপার: আসিফ নজরুলের সাক্ষাৎকারের বৈপরীত্য ও বিশ্লেষণ

গাজী আবু বকর : অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি ওই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, একই সঙ্গে তিনি প্রবাসী কল্যাণ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে তিনি আলোচনায় এসেছেন রাজনীতিতে, সামাজিক মাধ্যমেও আলোচিত। বিবিসি বাংলা গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচার করে। এই সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন, অধ্যাপক নজরুলের সে সময়ের ভূমিকা, রাজনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি কথা বলেন।

ঐ সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিলো— ‘মানে এই আলোচনাটাই শুধু ছিল, নাকি এর আগে আপনার সাথে এই পক্ষগুলোর কোনো যোগাযোগ—

উত্তরে তিনি বলেন, — ‘না, আমার সাথে পক্ষগুলোর যোগাযোগ হয় নাই। তবে ৫ই আগস্টের ৭-৮ দিন আগে আমার সাথে একজন আর্মি অফিসার পরিচয় দিয়ে, একজন সিভিল ড্রেসে ফুলার রোডে আমার সাথে গভীর রাতে দেখা করে এবং আমাকে বলে যে এরকম স্নাইপাররা কিছু লোককে মেরে ফেলতে পারে আন্দোলনের সাথে, তাদের মধ্যে আমার নামও আছে, আমি যেন সাবধানে থাকি। এবং আমি যেন সম্ভব হলে বাসায় না থাকি। এরকম একটা খবর দিয়েছিল। তো উনি কি আসলেও আর্মির লোক কিনা আমি এখনো জানি না, পরিচয় দিয়েছিল আর্মির লোক। কিন্তু তারপর থেকে আমি বেশ কয়েক রাত বাসায় থাকি নাই, আশেপাশে থাকতাম। তো এখন আপনার আমি সেটার খতিয়ে দেখি নাই পরে যে উনি আসলে আর্মির লোক কিনা।

একই বিষয়ে প্রথম আলো পত্রিকা গত ৬ আগস্ট ২০২৬ ইং তারিখে আসিফ নজরুলের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়,— শোনা যায়, জুলাইয়ের শেষ দিকে আপনাকে সতর্ক করা হয়েছিল।

উত্তরে আসিফ নজরুল বলেন,— ‘জি! হঠাৎ গভীর রাতে ফুলার রোড পাড়ার গেট থেকে বলা হলো, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এসেছেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি নামলাম। একপর্যায়ে কিছুটা আড়ালে গিয়ে উনি স্বীকার করলেন, উনি ব্র্যাকের শিক্ষক নন, সেনাবাহিনীর লোক। বললেন, স্যার, আমরা খবর পেয়েছি শেখ হাসিনার পক্ষে স্নাইপাররা নেমেছে, দূর থেকে লোকজনকে গুলি করছে। আর যেকোনো সময় আপনাদের যাঁরা নেতৃস্থানীয় আছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ব্যাপারটা আমি খুব সিরিয়াসলি নিইনি, কিন্তু পরে সিনিয়র দু-একজনকে এটা জানালে তারা বলল, হ্যাঁ, খুব সম্ভবত আর্মি থেকেই কেউ এসেছিল।
এরপর ৪ আগস্ট রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আরেকজন এসে আকুলভাবে অনুরোধ করেন, আমি যেন রাতে বাসায় না থাকি। আমাকে আর বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে নাকি মেরে ফেলা হবে। আমার স্ত্রী শীলা খুবই ভয় পেয়ে যায়। সে রাতে আমি ফুলার রোডেই অধ্যাপক মোস্তফা আল মামুনের বাসায় থাকি।

এখন প্রশ্ন হলো আসিফ নজরুল সময়ের ব্যাবধানে একই বিষয়ে দেয়া পৃথক দুটি সাক্ষাৎকারে একই প্রশ্নের উত্তর কেন সংশোধন করে দুভাবে দিলেন? কেন তিনি জুলাই অভ্যূত্থানের স্নাইপার প্রসঙ্গে বৈপরীত্য আনলেন?

উত্তরটা খুব সহজ। প্রথমবার তিনি সংঘটিত ঘটনার সত্যটাই বলেছিলেন। তাঁর সেই ভাষ্যে জুলাই অভ্যূত্থানে স্নাইপার ব্যবহার বিষয়ে আর এক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের দেয়া বক্তব্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক দিনগুলোতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র (যেমন- ৭.৬২ মিমি রাইফেল বা স্নাইপার টাইপ অস্ত্র) ও গুলির ধরন নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি মূলত প্রশ্ন তুলেছিলেন যে এই ধরনের সামরিক স্তরের অস্ত্র কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছিল।

তাঁর সেই ইঙ্গিতপুর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি সেসময় পাকিস্তান থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত লস্কর-ই-তৈয়ব নেতৃত্বের বক্তব্যে জুলাই অভ্যূত্থানকে বেগবান করতে আন্দোলনকারীরা যে স্নাইপার ব্যবহার করে আন্দোলনরতদের হত্যা করেছিলো— সেটা জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়।
আর তাই আসিফ নজরুল দীর্ঘদিন পর তাঁর দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যূত্থানকে বেগবান করতে আন্দোলনকারীরাদের স্নাইপার ব্যবহার করার ঘটনার আইনগত দায় নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাঁধে চাপানোর লক্ষ্যে খুব সচেতনভাবে বুঝে শুনে হিসেব করে নতুন বয়ান সৃষ্টি করেছেন।

সাখাওয়াত হোসেন ও আসিফ নজরুলের বক্তব্যের বৈপরীত্য ও পটভূমি:
সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক দিনগুলোতে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন খুব স্পষ্টভাবে আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র (যেমন- ৭.৬২ মিমি রাইফেল বা স্নাইপার টাইপ অস্ত্র) ও গুলির ধরন নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি মূলত প্রশ্ন তুলেছিলেন যে এই ধরনের সামরিক স্তরের অস্ত্র কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছিল। তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলেন, আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে বৃহৎ অংশের মূখায়ব ও দৈহিক গঠন আমাদের দেশের মানুষের সাথে মেলেনা।

বিবিসি বাংলায় আসিফ নজরুলের প্রথম বক্তব্য: বিবিসি বাংলায় আসিফ নজরুল বলেছিলেন যে, একজন ব্যক্তি (যিনি সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়েছিলেন) গভীর রাতে এসে তাঁকে সতর্ক করেন—“স্নাইপাররা কিছু লোককে মেরে ফেলতে পারে… তাদের মধ্যে আপনার নামও আছে।” এখানে তিনি স্নাইপার কারা চালিয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পক্ষের নাম উল্লেখ করেননি।
প্রথম আলো পত্রিকায় আসিফ নজরুলের দ্বিতীয় বক্তব্য: পরবর্তীতে প্রথম আলো পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন— হঠাৎ গভীর রাতে ফুলার রোড পাড়ার গেট থেকে বলা হলো, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এসেছেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি নামলাম। একপর্যায়ে কিছুটা আড়ালে গিয়ে উনি স্বীকার করলেন, উনি ব্র্যাকের শিক্ষক নন, সেনাবাহিনীর লোক। উক্ত ব্যক্তি তাঁকে এসে জানিয়েছিলেন যে “শেখ হাসিনার পক্ষে স্নাইপাররা নেমেছে…”।


কেন দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও ‘শেখ হাসিনার পক্ষ’— এর নাম এল?
আসিফ নজরুল কেন প্রথম সাক্ষাৎকারে নীরব থেকে দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে সুনির্দিষ্ট করে শেখ হাসিনার নাম বললেন— তা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা বিশ্লেষণ করা যায়। সমালোচকদের মতে আসিফ নজরুল হিসেব করে বয়ান পরিবর্তন করেছেন। কারণ রাজনৈতিক দায় এড়ানো। সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যের পর যখন আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের পক্ষেও কোনো সশস্ত্র এলিমেন্ট বা স্নাইপার ব্যবহারের সন্দেহ বা প্রশ্ন উঠছিল, তখন দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে আসিফ নজরুল খুব সতর্কভাবে স্নাইপারের পুরো দায় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের ওপর স্থানান্তর করেছেন।

এ ছাড়াও রাজনৈতিক বয়ান সুসংহত করা; জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লিগ্যাসি রক্ষা এবং আন্দোলনকে শতভাগ ‘নিপীড়িত ও নিরস্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করতেই তিনি দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে বিষয়টি পুনর্গঠন করেছেন বলে অনেকেই মনে করেন।

উপসংহার:
সুতরাং, নিঃসন্দেহে বলা যায়, আসিফ নজরুলের প্রথম ও দ্বিতীয় বক্তব্যের ফারাকের কারণ হলো, রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখা এবং স্নাইপার ব্যবহারের বিতর্ককে নির্বাসিত শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে একপাক্ষিক রাখতে তিনি পরবর্তীতে খুব সচেতনভাবে বুঝে শুনে হিসেব করে ব্যাখ্যাটি সুনির্দিষ্ট করে নতুন বয়ান সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যের পাশাপাশি সেসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া নানা বক্তব্য ও গুঞ্জন, লস্কর-ই-তৈয়বার বক্তব্য এবং ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের অস্ত্র সংক্রান্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য—সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে বহিরাগত বা সশস্ত্র উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটেই পরবর্তীতে আসিফ নজরুল তাঁর দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে স্নাইপার ব্যবহারের পুরো আইনি ও রাজনৈতিক দায় সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাসিত শেখ হাসিনার সরকারের ওপর স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন বলে সমালোচকদের একাংশ মনে করেন।

Share