জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের জন্য আরও জমি চায়, আপত্তি ঢাকার

নিজ দেশে ফিরতে চান তারা

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য অতিরিক্ত জমি বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ। তবে এ প্রস্তাব গ্রহণ না করে তা নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে ঢাকা। অন্যদিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এখন আর শরণার্থী শিবিরে বন্দি জীবন কাটাতে আগ্রহী নন। তারা নিজেদের ভিটেমাটিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে এই জনগোষ্ঠীর টেকসই প্রত্যাবাসনই বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
শনিবার (২০ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য আবাসন ও মানবিক সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন জমি বরাদ্দের বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আলোচনা করা হলেও সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। সরকারের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নতুন শরণার্থী অবকাঠামো তৈরিতে নয়, বরং তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনে।

এদিকে জাতিসংঘে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, ফলে এর টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, কিন্তু দীর্ঘায়িত এই সংকট দেশের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে সংকটের দ্রুত ও কার্যকর সমাধান এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক অংশীজনদের প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি মিয়ানমারে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন।

সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরাও তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরতে চায়। প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এজন্য রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংকটের মূল কারণগুলো দূর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের আগে বিভিন্ন সময়ে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার পাশাপাশি ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

এরপর থেকে একাধিকবার প্রত্যাবাসন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও টেকসইভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

নিজ দেশে ফিরতে চান রোহিঙ্গারা: জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এখন আর শরণার্থী শিবিরে বন্দি জীবন কাটাতে আগ্রহী নন। তারা নিজেদের ভিটেমাটিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই জনগোষ্ঠীর টেকসই প্রত্যাবাসনই বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের ব্রিফিংয়ে এই অবস্থান তুলে ধরেন। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত ওই সভায় তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গারা নিজেরাই এখন দ্রুত স্বদেশে ফেরার পক্ষে। বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে মানবিক কারণে ১২ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।

বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে নানা জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। দেশের সীমিত সম্পদের ওপর এই বাড়তি চাপ মোকাবিলা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

রোহিঙ্গা সংকটের মূল ভিত্তি মিয়ানমারে নিহিত থাকায় এর সমাধানও সেই দেশেই খুঁজতে হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক অংশীজনদের প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংঘাতময় এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এলে এই বাস্তুচ্যুত মানুষেরা দ্রুত নিজ দেশে ফিরতে পারবেন। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের শান্তিপূর্ণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

Share