ট্রাম্পের ইরান চুক্তি ভেস্তে দিতে পারেন নেতানিয়াহু? মার্কিন গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তা

লেবানন-গাজায় ইসরায়েলি নতুন হামলায় নিহত ১৫

নয়াবার্তা ডেস্ক :মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত নতুন শান্তি ও সমঝোতা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, সেই উদ্যোগের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেই আশঙ্কার মধ্যেই লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় সেনা সদস্যসহ ৮ জন নিহত। আর গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৫জন। খবর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিরাপত্তা কৌশলের কারণে নেতানিয়াহু এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাঠানো এক গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো লেবাননে উত্তেজনা কমানো এবং যুদ্ধ বন্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করা।

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যদি ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করে অথবা দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সদ্য গড়ে ওঠা কূটনৈতিক সমঝোতা দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফ্রান্সে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেন, লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ‘কিছু মতবিরোধ’ রয়েছে।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসও প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে যাতে তারা এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নেয়, যা ইরানের সঙ্গে অর্জিত সমঝোতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমানে বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং প্রধান মিত্র। ফলে ওয়াশিংটনের উদ্বেগকে উপেক্ষা করা ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর অবস্থান শুধু নিরাপত্তা বিবেচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকেও কঠোর হয়ে উঠেছে।

আগামী নির্বাচনের আগে তিনি ইসরায়েলি ভোটারদের সামনে নিজেকে কঠোর নিরাপত্তানীতির নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। ২০২৩ সালের পর থেকে হিজবুল্লাহর হামলা এবং উত্তর ইসরায়েলের লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

একাধিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিক হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। ফলে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার বা সামরিক অভিযান কমিয়ে আনা নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চুক্তি ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ইসরায়েলের উদ্বেগ হলো; চুক্তির ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়াতে সক্ষম হবে।
ইসরায়েলের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাই ছিল সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। চুক্তির মধ্যেও লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই হামলার মাত্রা আরও বাড়ে, তাহলে হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এবং সেই পরিস্থিতি ইরানকেও সরাসরি চুক্তি থেকে সরে আসার অজুহাত দিতে পারে।

মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, লেবাননে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে পুরো শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বেশ কিছু শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক হাতিয়ার রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে; উন্নত অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করা, যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা কমানো, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করা, আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা কমিয়ে দেওয়া, সামরিক সহযোগিতার কিছু অংশ স্থগিত করা, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত এসব পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক থাকেন, ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও উপেক্ষা করতে পারছে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি জটিল ভারসাম্যের খেলা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ সফল হবে নাকি নেতানিয়াহুর কঠোর নিরাপত্তা কৌশল নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে—সেটিই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় সেনা সদস্যসহ ৮ জন নিহত: লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণার পরও নতুন করে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে দুই শিশু ও এক সেনা সদস্যসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। শনিবার এই হামলার ঘটনা ঘটে।

ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানায়, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার জেলার বারিশ শহরে ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশু ও তাদের বাবা-মা নিহত হয়েছেন।

নাবাতিহ প্রদেশের আরবসলিম শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।

একই প্রদেশের দেইর আল-জহরানির পূর্ব প্রবেশপথে একটি মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে একজন নিহত হন। একই শহরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অপর এক হামলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া আপার নাবাতিহ, নমেরিয়েহ, চৌকিন, হাব্বুশ, কফারজৌজ, জিবদিন, সাজদ এবং মাহমুদিয়েহ শহরেও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়। ভোরে নাবাতিহ শহরের কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকাগুলোতেও কামানের গোলাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বাহিনী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে লেবানিজ সেনাবাহিনী বলেছে, ‘লেবাননে বর্বরোচিত ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।’

তারা আরও উল্লেখ করে, সাম্প্রতিক এই আগ্রাসন দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি কফার রুমান-নাবাতিহ সড়কে যাওয়ার সময় তাদের এক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

লেবানিজ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৩ হাজার ৯৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা।

শুক্রবার ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ এক অজ্ঞাত কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুরু হয়েছে। একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তাও আনাদোলুর কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫: গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। নতুন করে চালানো এক হামলায় একই পরিবারের চারজনসহ অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে গাজা উপত্যকায় এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে।

গাজা সিটির আল-তায়ারান মোড়ের কাছে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুই শিশু ও তাদের বাবা-মা নিহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে সাফাদি পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। হামলায় নিহতরা হলেন হুসেইন সাফাদি, রানা সাফাদি এবং তাদের দুই মেয়ে ৬ বছর বয়সী জিনা ও ১৩ বছর বয়সী লানা। এছাড়া পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য এবং আশেপাশের বাসিন্দারা আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, উত্তর গাজা সিটির আল-সাফতাউয়ি গোলচত্বরের কাছে পথচারীদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। এই ঘটনায় এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত ও এক নারী আহত হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ক্রমাগত লঙ্ঘন করে চলেছে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এসব চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন।

গাজায় ইসরায়েলের টানা দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই দুই বছরের বর্বরোচিত আগ্রাসনে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এছাড়া গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে যায়।

Share