
রাজশাহী প্রতিনিধি : অভিযোগ তদন্তে গিয়ে পুলিশ কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে বিভাগীয় মামলা খেয়েছেন এক উপপরিদর্শক (এসআই)। মামলা হওয়ার পর থেকে ওই এসআই নানাভাবে পুলিশ কনস্টেবলকে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ওই এসআইয়ের নাম আবদুর রউফ। আগে তিনি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) বোয়ালিয়া ও মতিহার থানায় ছিলেন। বর্তমানে আছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া থানায়। আর ভুক্তভোগী কনস্টেবল আছেন পাবনার একটি ফাঁড়িতে।
স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ওই কনস্টেবল গত বছর আরএমপির কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ অভিযোগের তদন্ত করে। ১২৭ পাতার তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে অভিযুক্ত এসআইয়ের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। পরে আরএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম মামলা তদন্ত করে সম্প্রতি প্রতিবেদন দেন।
ওই পুলিশ কনস্টেবল অভিযোগে উল্লেখ করেছিলেন, তাঁর ছেলে রাজশাহীর একটি স্কুলে পড়াশোনা করে। তাই তাঁর স্ত্রী সেখানে নিজের বাবার বাড়িতেই থাকেন। বাড়ির অংশ নিয়ে বোনদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে এক শ্যালিকা নগরের বোয়ালিয়া থানায় অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পান থানার তৎকালীন এসআই আবদুর রউফ। বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলে এসআই আবদুর রউফ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে ওই এসআই নিচতলার একটি ঘর দখল করে ভাড়াটিয়া হিসেবে সেখানে থাকতে শুরু করেন।
কনস্টেবল অভিযোগে উল্লেখ করেন, একদিন তিনি পাবনা থেকে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখতে পান, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ডাইনিংয়ে বসে খাচ্ছেন ওই এসআই। তিনি সেদিনই প্রথম তাঁর পরিচয় জানতে পারেন। স্ত্রীর কাছে তিনি জানতে পারেন, অভিযোগ তদন্ত করতে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এরপর ওই এসআই তাঁর শ্বশুরবাড়ির একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠেছেন। তিনি একা থাকেন। রান্নার সমস্যা বলে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে খান।
ওই কনস্টেবলের অভিযোগ, তিনি যখন ছুটিতে শ্বশুরবাড়ি যান, তখন ওই এসআই বাড়িতে আসেন না। একদিন গভীর রাতে তাঁর স্ত্রী যখন ঘুমাচ্ছিলেন, তখন তাঁকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান ওই এসআই। কনস্টেবল মেসেঞ্জারের কথোপকথনে দেখেন, দুজনের একসঙ্গে তোলা ছবি এবং কুরুচিপূর্ণ বার্তা আদান–প্রদান হয়েছে। তিনি বুঝতে পারেন, স্ত্রীর সঙ্গে ওই এসআইয়ের পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওই রাতেই তিনি এসআইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে উচ্চবাচ্য করেন। তাঁর স্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, তাঁর ভুল হয়ে গেছে। তিনি আর এসআইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন না। কিন্তু সম্পর্ক ঠিকই চালিয়ে গেছেন।
ওই কনস্টেবল অভিযোগে উল্লেখ করেন, পাবনার একটি থানায় দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গত বছর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। সেদিন স্ত্রী তাঁকে জানান, ওই এসআইয়ের কাছে তাঁদের দুজনের মেলামেশার ভিডিও আছে। সেটি দিয়ে তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিম্মি করে রেখেছেন। ফলে তাঁর স্ত্রী না চাইলেও এসআইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এ কথা শোনার পর থানার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তখন দুজন কনস্টেবল তাঁকে ধরে ফেলেন এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে নিয়ে যান। ওসি সবকিছু শুনে তাঁকে সংশ্লিষ্ট সার্কেল এএসপির কাছে নিয়ে যান। ওই এএসপি সব শুনে তাঁকে আরএমপির পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি এই লিখিত অভিযোগ করেন।
ওই কনস্টেবল বলেন, এসআই আবদুর রউফ এখন তাঁর স্ত্রীকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিচ্ছেন না। বিভাগীয় মামলা হওয়ার পর ওই এসআই তাঁরই স্ত্রীকে দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কাছে একটি অভিযোগ করিয়েছেন। এ ছাড়া আদালতে যৌতুকের একটি মিথ্যা মামলা করানো হয়েছে বলেও ওই কনস্টেবল অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগী পুলিশ কনস্টেবল বলেন, ‘এসআই আবদুর রউফ আমার সংসারে আগুন লাগিয়েছেন। তিনি আমার স্ত্রীকেই যোগাযোগ করতে দেন না। আমার স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পরকীয়া সম্পর্ক পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। বিভাগীয় মামলা হওয়ার পর তিনি আমার স্ত্রীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা করিয়েছেন, যাতে আমার চাকরি না থাকে। এসব কারণে আমি দুই দফা স্ট্রোক করেছি। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশে ব্যাপক বদলির সময় এসআই আবদুর রউফ রাজশাহী থেকে সাতক্ষীরার কলারোয়া থানায় বদলি হয়ে যান। উল্লিখিত বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, ওই কনস্টেবল ও তাঁর স্ত্রীকে তিনি চেনেন না। কনস্টেবলের শ্বশুরবাড়ির একটি ঘরে বসবাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভাড়া উঠেছিলাম। তবে তাঁর সঙ্গে আমার পরকীয়া নেই।’
এসআই রউফ এ সময় তাঁর পরকীয়া সম্পর্কের প্রমাণ দেখতে চান। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে কনস্টেবলের লিখিত অভিযোগ ও তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া বিভাগীয় মামলার কপি, কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ছবি ও মেসেঞ্জারে কথোপকথনের স্ক্রিনশট পাঠানো হয়। এরপর ফোন কল করলে তিনি আর ধরেননি।
আর এসআই রউফের কথায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবলের স্ত্রী ফোন কল কেটে দেন।
এসআই রউফের বিরুদ্ধে হওয়া বিভাগীয় মামলার সর্বশেষ জানতে চাইলে আরএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিভাগীয় মামলা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার নিয়ম নেই।’