‘মানসিক হাসপাতাল দেখ‍ার ইচ্ছা পুরণ’

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। এর মধ্যেই পাবনা মানসিক হাসপাতাল প্রাঙ্গণে শত শত মানুষের ভিড়। ফটকে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে টাকা দিয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—বিভিন্ন বয়সী মানুষ প্রবেশ করছেন ভেতরে। রোগীদের কক্ষের সামনে বারান্দাজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কেউ রোগীদের ডাকছেন, কেউবা ঘরে বন্দী রোগীদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতেছেন।

আজ শুক্রবার দুপুরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃষ্টির মধ্যে দূরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাঁরা হাসপাতাল ঘুরে দেখছেন। উৎসুক দর্শনার্থীদের হাঁকডাকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কিছু রোগী। আবার ঈদে স্বজনদের দেখা না পেলেও এসব দর্শনার্থীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে দেখা গেছে কয়েকজন রোগীকে।

মো. জোবায়ের মিয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি)। তিনি বলেন, মানসিক হাসপাতালে দর্শনার্থীদের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। দর্শনার্থী প্রবেশ করলে রোগীদের দুই ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাঁরা রোগীদের পরিচয় জেনে বাইরে প্রচার করতে পারেন। অন্যদিকে রোগীরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে বন্দী রয়েছেন। তাঁরা অন্যদের আনন্দ দেখলে নিজেরা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এতে তাঁদের অসুস্থতা বেড়ে যেতে পারে।

বেলা তিনটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, দুজন আনসার সদস্য হাসপাতাল ফটক পাহারা দিচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছেন হাসপাতালের এক কর্মচারী। ৫০ থেকে ২০০ টাকা—যিনি যেমন দিচ্ছেন, তার বিনিময়েই দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে হাসপাতালের ভেতরে।

পরিচয় জানতে চাইলে ওই কর্মচারী বললেন, তাঁর নাম আবদুল কুদ্দুস। তিনি হাসপাতাল কর্মচারীদের সরদার। মূলত তাঁর তত্ত্বাবধানেই দর্শনার্থীরা হাসপাতালে প্রবেশ করছেন। হাসপাতালে দায়িত্বপূর্ণ কেউ আছেন কি না, জানতে চাইলে আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘হাসপাতালে এখন কেউ নেই। সবাই ছুটিতে। আমিই সব। বহু বছর ধরে আছি। কয় দিন পর চাকরি শেষ হবে। যা বলতে হয়, আমাকেই বলুন।’

ঈদ উপলক্ষে রোগীদের স্বজনেরা কেউ দেখতে আসেননি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘না। সুযোগ নেই। স্বজনদের রোগীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না।’ তাহলে এত মানুষকে ভেতরে যেতে দিচ্ছেন কেন? এর জবাবে আবদুল কুদ্দুস বললেন, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। দেখতে চায়। তাই যাচ্ছে। এসব বিষয়ে কিছু বলার নেই।

আবদুল কুদ্দুসের পরই কথা হয় দায়িত্বরত আনসার সদস্য আবদুল জলিলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে লোকজন বেড়াতে আসছেন। সবাই একটু হাসপাতালের ভেতরটা দেখতে চান। তাই যিনি যা দিচ্ছেন, তা নিয়েই একটু সুযোগ দিচ্ছেন। কারণ, ঢুকতে না দিলেও লোকজন ঝগড়া বাধায়। ঝামেলা হয়। তাই এ ব্যবস্থা।

কথা হয় কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ঈদে বেড়ানোর কোনো জায়গা নেই। অন্যদিকে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই তাঁরা মানসিক হাসপাতাল দেখতে এসেছেন। হাসপাতালের ভেতরটা ঘুরে দেখেছেন। তাঁদের ভালো লেগেছে। আতাইকুলা থেকে সপরিবার এসেছিলেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বেড়ানোর কোনো জায়গা নেই। তাই হেনে আইছি। পুলাপান ইকটু দেখল, এই আরকি।’

জেলা শহরের পৈলানপুর মহল্লার মাসুম বিল্লাহ বলেন, তাঁদের ইচ্ছা ছিল ঈদ উপলক্ষে ঈশ্বরদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখতে যাবেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে যেতে পারেননি। তাই মানসিক হাসপাতালে এসেছেন।

তবে অনেকে আছেন, যাঁরা হাসপাতাল দেখতেই এসেছেন। তাঁদের একজন সুস্মিতা আক্তার। তিনি বলেন, ‘অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল মানসিক হাসপাতাল দেখব। তাই ঈদ উপলক্ষে আসছি। ওদের (রোগীদের) সঙ্গে মজা করছি। ওরা গান শুনাইছে। ভালো লাগছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসপাতালের চিকিৎসক আঞ্জুমান-ই-ফেরদৌস বলেন, ‘দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধে আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। মানুষ জেনারেল হাসপাতাল দেখতে যায় না, সব আগ্রহ এখানেই। তবে আমরা বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার চেষ্টা করছি।’

ভর্তি রোগীদের স্বজনেরা কেউ ঈদে এসেছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগীর স্বজনদের আসার সুযোগ আছে। তাঁরা চাইলে ঈদসহ বিশেষ বিশেষ দিনে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। কেউ এলে তাঁরা দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন। তবে কেউ কোনো দিন আসেননি। তবে তাঁরা না এলেও রোগীদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ আয়োজন করে থাকে। বিশেষ দিনে তাঁদের জন্য বিশেষ উন্নত খাবার পরিবেশন করা হয়।

Share