হাসপাতালের বেড থেকে মুমূর্ষুকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা

গণপিটুনিতে দুই জেলায় প্রাণ গেলো দুই যুবককের

দুই জেলায় দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামনে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। সাতক্ষীরায় পুলিশের উদ্ধার করা এক যুবককে হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে দলবদ্ধ লোকজন ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। অন্যদিকে নোয়াখালীতে এক প্রতিবন্ধী যুবককে চোর সন্দেহে গাছে বেঁধে নির্যাতনের পর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ফেলে রেখে যায় একদল লোক। দুই ঘটনায়ই অভিযোগের বিচার আদালতে হওয়ার বদলে জনতার হাতে প্রাণ গেল দুই যুবকের। সাতক্ষীরায় হাসপাতালের ভেতরে পুলিশের উপস্থিতিতেও হামলাকারীদের ঠেকানো না যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় নিহত যুবকের নাম ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮)। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ছড়িয়ে পড়া অডিও রেকর্ডিংকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন তাঁকে মারধর করে। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পরও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল হাসপাতালে হামলা চালায়। তারা পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়। পুলিশ, আনসার সদস্য ও হাসপাতালের কর্মীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও হামলাকারীদের থামানো যায়নি। পরে তাঁকে আবারও মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

একজন রোগীকে পুলিশের মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি করার পর সেখানে কীভাবে এত বড় দল ঢুকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করল—এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি। হাসপাতালের ভেতরে হামলাকারীদের প্রবেশ, ওয়ার্ড থেকে রোগীকে তুলে নেওয়া এবং তাঁকে রক্ষা করতে না পারার ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং হামলাকারীদের ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তের দাবি রাখে।

হাসপাতালের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অন্য রোগীদের সামনেই শামীমকে ওয়ার্ডে মারধর করা হয় এবং পরে টেনেহিঁচড়ে বের করে নেওয়া হয়। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেছেন, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এমন গুরুতর ঘটনার পর কেবল অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে হামলাকারীদের শনাক্ত এবং দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি কিছুদিন ধরে অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন এবং কয়েক দিন আগে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। পরিবারের ভাষ্য, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি এবং হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনায় সেই আইনি সুরক্ষাই কার্যত অনুপস্থিত ছিল।

নোয়াখালীর ঘটনায়ও একইভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি দেখা গেছে। সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের ইসলামগঞ্জ বাজার এলাকায় গত মঙ্গলবার দুপুরে চোর সন্দেহে কবির হোসেন (৩৫) নামের এক প্রতিবন্ধী যুবককে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল মারধর করে। অভিযোগ, আলাউদ্দিন মুন্সীর নেতৃত্বে তাঁকে নাইলনের দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে লাঠি, ঘুষি ও লাথি দিয়ে নির্যাতন করা হয়।

পরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নোয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের কাছে একটি অটোরিকশায় করে তাঁকে নিয়ে ফেলে রাখা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অর্থাৎ নির্যাতনের পর তাঁকে ফেলে যাওয়ার আগেই বা পরে কী ঘটেছে, তা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তে বের করা জরুরি।

কবিরের মা কমলা বেগমের করা হত্যা মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। যৌথ অভিযানে মঙ্গলবার রাতে প্রধান অভিযুক্ত আলাউদ্দিন মুন্সী (২৮), ফারুক উদ্দিন শুভ (২৪), হোসাইন (৩৪) ও তারেককে (২৩) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অটোরিকশাটিও। বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তাইয়েব মোহাম্মদ আরিফ হোসেন এসব তথ্য জানান।
দুই ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের পাশাপাশি বড় প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—গণপিটুনি ঠেকাতে পুলিশ কতটা প্রস্তুত, আক্রান্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর এবং দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি থাকলে তার জবাবদিহি কীভাবে হবে? সাতক্ষীরায় পুলিশের উদ্ধার করা একজন মানুষ হাসপাতালেও নিরাপদ থাকলেন না; নোয়াখালীতে একজন প্রতিবন্ধীকে দলবদ্ধভাবে নির্যাতনের পর ফেলে রাখা হলো। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অপরাধের বিচার আদালতের কাজ। জনতার হাতে কাউকে তুলে দেওয়া কিংবা পুলিশের সামনে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার সুযোগ তৈরি হওয়া—দুটিই আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক।

Share