
নয়াবার্তা ডেস্ক : নিরাপদ বিনিয়োগমাধ্যম হিসেবে সোনার প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে তা নতুন রূপ নিচ্ছে—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এ বাস্তবতায় সোনায় বিনিয়োগকৌশলেও পরিবর্তন আসছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার ২৭৮ ডলার। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহ দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও এরপর সোনার দাম ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে সোনার দাম। জুন মাসে সোনার দাম কমে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক পতনের মুখে পড়ে সোনা। খবর দ্য ন্যাশনালের
সাধারণত অনিশ্চয়তা, ডলারের দুর্বলতা, মুদ্রানীতিতে শিথিলতা কিংবা আর্থিক সম্পদের ওপর আস্থাহীনতা—এমন বাস্তবতায় সোনার দাম বেড়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার বেশি হলে এবং ডলার চাঙা হলে সোনা চাপে পড়ে।
দুবাইভিত্তিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ইকুইটি গ্রুপের মার্কেট ইনসাইটস ও কমিউনিটি এনগেজমেন্টের প্রধান নুরেলদিন আল হাম্মুরি বলেন,‘যুদ্ধ, রাজনৈতিক ধাক্কা বা শেয়ারবাজার পতনের সময় সোনার দাম বাড়বেই—এমন নিয়ম নেই।’
নুরেলদিন আরও বলেন, স্বল্প মেয়াদে নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের সঙ্গে সোনার প্রতিযোগিতা হয়। একই সঙ্গে সোনার দাম মার্কিন ডলার ও প্রকৃত সুদহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ও বন্ডের সুদহার বেড়ে গেলে সোনার দাম কমতে পারে। কেননা, বিনিয়োগকারীরা তখন ট্রেজারি সিকিউরিটিজে তুলনামূলক বেশি মুনাফা পান, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পরও।
নুরেলদিনের মতে, সোনা এখনো কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলার মাধ্যম, তা ঠিক, তবে সোনায় বিনিয়োগ করে সুদ পাওয়া যায় না। ফলে স্বল্প মেয়াদে সোনায় বিনিয়োগ করা অনেক সময় লাভজনক নয়।
সম্ভাব্য উল্লম্ফন
দাম কমলেও ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, গত এক বছরে যেসব সম্পদের দাম সবচেয়ে বেড়েছে, তাদের মধ্যে সোনা অন্যতম, যদিও অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে সোনার সেই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমছে।
প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, বছরের প্রথমার্ধে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে সোনার দাম কমেছে।
লন্ডনভিত্তিক এই সংস্থার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মূল্যবৃদ্ধির ধারা শুরু হলে সোনার দাম আবার ৪ হাজার ৫০০ ডলারে উঠতে পারে। জে পি মরগ্যানও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে সোনার দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলার এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৪ হাজার ৩০০ ডলারে থিতু হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি, নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সুদহার কমার প্রত্যাশা কিংবা কম দামে সোনা কেনার প্রবণতা—এসব কারণে আবারও সোনার দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে, বন্ডের সুদ বাড়লে ও বাজার স্থিতিশীল থাকলে সোনার দাম আরও কমতে পারে। বর্তমান দামের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি কমে গেলে কম দামে সোনা কেনার চাহিদা বাড়বে—এ প্রবণতা সোনার দামের বড় ধরনের পতন ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।
দুবাইভিত্তিক টিয়ারা জেমস অ্যান্ড জুয়েলারির প্রতিষ্ঠাতা আশীষ বিজয় বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সোনা ঠিক আর নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম নয় বা এমনকি বিশেষ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় মানুষ সোনায় বিনিয়োগ করবে—এমনও নয়, বরং এটি এখন কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ বিনিয়োগমাধ্যম হিসেবে সোনার যে পরিচিত, তাতে পরিবর্তন আসছে।
আশীষ বিজয় আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক সোনা কেনা, সার্বভৌম ঋণ নিয়ে উদ্বেগ, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার বৈচিত্র্য—এসব কারণে তীব্র ভূরাজনৈতিক সংকট না থাকলেও সোনার চাহিদা কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার অগ্রগতির দিকেও নজর রাখছেন বাজার পর্যবেক্ষকেরা। তেলের দাম কমলে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে। মাঝে তেলের দাম অনেকটা কমে গিয়েছিল ঠিক, তাতে গত এক মাসে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৩৩ ডলার বেড়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এক্সনেসের কৌশলবিদ এরিক চিয়ার মতে, আলোচনায় জটিলতা তৈরি হলে সোনার দাম আবার কমতে পারে। হয়েছেও তা–ই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি অকার্যকর ঘোষণা করার পর গত শুক্রবার সোনার দাম এক দিনে আউন্সপ্রতি ২৩ ডলার কমেছে।
এরিক চিয়া আরও বলেন, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভিসেস পিএমআই (সেবা খাতের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সূচক) ও ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী বক্তব্য থেকে বোঝা যাবে, বাজার সুদহার বৃদ্ধির প্রত্যাশা থেকে আরও সরে আসবে, নাকি আবারও কঠোর মুদ্রানীতির আশঙ্কায় সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন করবে। এমন আশঙ্কা থেকে সম্প্রতি সোনার দামের এই পতন।
বাজার যদি মনে করে ফেড তুলনামূলক নমনীয় মুদ্রানীতি অনুসরণ করবে, তাহলে বন্ডের সুদহার কমতে পারে। এতে সোনার পালে কিছুটা হাওয়া লাগতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
এদিকে গত মাসের আরেক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল বলেছে, মূল্য কমলেও আগামী ১২ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনার মজুত বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় তারা এই কৌশল নেবে।
নুরেলদিন আল হাম্মুরি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন আর শুধু সুদহারের মাধ্যমে সোনার বাজারে প্রভাব ফেলছে না; বরং তারা সরাসরি কৌশলগত ক্রেতা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উদীয়মান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সোনাকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে একধরনের সুরক্ষা হিসেবে দেখছে। এ ধরনের সম্পদের ঝুঁকি নেই, অন্য কোনো দেশের পক্ষে সহজে তা জব্দ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ডলারভিত্তিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে সোনা।
নুরেলদিন আরও বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সোনার বাজারে স্থায়ী ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সুদহার বৃদ্ধির কারণে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক ক্রয় দীর্ঘ মেয়াদে সোনার পালে হাওয়া দিতে পারে।
সুইস ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারও মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয় এখন সোনার বাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি চালিকা শক্তি।
অন্যদিকে সোনার চাহিদার কেন্দ্র ধীরে ধীরে পূর্বমুখী হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো লন্ডন ও নিউইয়র্ককে ভিত্তি করে সোনার দাম নির্ধারিত হয়, প্রকৃত কেনাকাটার বড় অংশ হচ্ছে এশিয়ায়, বিশেষ করে চীন ও ভারতে, সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যেও।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ১৯ মাস ধরে সোনার রিজার্ভ বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির নিট সোনা আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এতে পশ্চিম ও পূর্বের বিনিয়োগ প্রবণতার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বল্পমেয়াদি মুনাফার উদ্দেশ্যে সোনায় বিনিয়োগ করেন। এর বিপরীতে এশিয়ার পরিবার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনাকে দীর্ঘ মেয়াদে সম্পদ সংরক্ষণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার উপায় হিসেবে দেখে, পার্থক্যটা দৃষ্টিভঙ্গির।
স্বল্প মেয়াদে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচা সোনার দামে প্রভাব ফেলে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এশিয়ার ক্রেতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক চাহিদাই বাজারে হাওয়া দিচ্ছে।
আশীষ বিজয়ের মতে, এ অঞ্চলে বিনিয়োগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক সোনার বাজারেও ধীরে ধীরে ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, পূর্বের দেশগুলোই যে এখন সোনার দাম পুরোপুরি নির্ধারণ করছে, বিষয়টি তা নয়। তবে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ নির্ধারণে তাদের প্রভাব কেবল বাড়ছে।
