নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধর ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েই চলছিল সেই গাড়িটি

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : যে গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহম্মেদ খানকে মারধর করা হয়েছিল, সেই গাড়ির ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ নেই। অথচ ‘সংসদ সদস্য’ স্টিকার নিয়ে গাড়িটি রাস্তায় চলাচল করছিল।

গত রোববার রাতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছিল ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-৫৭৩৬ নম্বরের গাড়িটি। এরপর ওই গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে ওয়াসিফকে মারধর করেন। গাড়িতে সাংসদ হাজি সেলিমের ছেলে ইরফান মোহাম্মদ সেলিম ছিলেন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য বরখাস্ত কাউন্সিলর। সোমবার র‌্যাব পুরান ঢাকায় হাজি সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইরফান ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে। পরে ইরফানকে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেড় বছরের কারাদণ্ড দেন।

যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তারা যানবাহনের রোড ট্যাক্সও আদায় করে। সংস্থাটির যানবাহন নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, সাংসদের স্টিকার লাগানো ব্রিটিশ ব্র্যান্ড ল্যান্ড রোভার গাড়িটির ইঞ্জিনক্ষমতা ২৪৯৫ সিসি। এটি প্রথমে ইউরোপের একটি দেশের দূতাবাসের জন্য আনা হয়েছিল।

পরে ২০০৪ সালে দূতাবাস গাড়িটি নিলামে তুললে অটোটেক লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়। কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার জন্য আনা গাড়ি শুল্কমুক্ত। তবে বাংলাদেশে গাড়িটি বিক্রি করে দিলে ক্রেতাকে নিবন্ধনের সময় পুরো শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ২০০৫ সালে গাড়িটির মালিকানা বদল করা হয়।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, ২০১০ সাল থেকে এই গাড়ির ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই। ২০০৫ সাল থেকে রোড ট্যাক্সও দেওয়া হয়নি। বর্তমানে এই শ্রেণির গাড়ির রোড ট্যাক্স বছরে ৭৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিবছর ফিটনেস সনদ হালনাগাদের ফিও আছে। ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ না থাকলে নির্ধারিত হারে জরিমানার বিধান রয়েছে।

বিআরটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি নিবন্ধনের সময় একসঙ্গে পাঁচ বছরের ফিটনেস সনদ দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রতিবছর একবার করে সনদ নবায়ন করতে হয়। ট্যাক্সও দিতে হয় প্রতিবছর। ২০০৫ সালে গাড়িটির মালিকানা বদলের পর মালিক বিআরটিএর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।

হাজি সেলিমের ছেলে কারাগারে। যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁদের পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের মামলায় গাড়িটি ধানমন্ডি থানায় আটক আছে।

বিআরটিএর হিসাব বলছে, ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৫৩৬টি যানবাহনের ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই। এর মধ্যে জিপ ও কারের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে গত বছর ১ নভেম্বর। আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো মোটরযানের মালিকানা পরিবর্তন হলে এর মালিককে ৩০ দিনের মধ্যে সেটি লিখিতভাবে জানাতে হবে। আর যানবাহনের গ্রহীতাকে (ক্রেতা) ৬০ দিনের মধ্যে নিজ নামে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন করিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে। বিআরটিএ ৩০ দিনের মধ্যে মালিকানা বদল করে ক্রেতার নামে নিবন্ধন দেবে।

সড়ক পরিবহন আইনের ২১ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া আইনে ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ না থাকাও অপরাধ।

মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ নিয়ে গাড়ি চালানোর দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। একই সাজা প্রযোজ্য হবে ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ না থাকলেও।

Share