
নয়াবার্তা ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়া আজ ১৯৮০-এর দশকের ঐতিহাসিক ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধের’ পর সবচেয়ে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ওয়াশিংটন কর্তৃক দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের প্রত্যক্ষ পরিণতি।
মার্কিন হঠকারিতার জবাবে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ এখন রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বেরিয়ে কৌশলগতভাবে আক্রমণাত্মক মোড় নিয়েছে।
সামুদ্রিক চোকপয়েন্টের নয়া চালিকাশক্তি
এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট—হরমুজ প্রণালী এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই কৌশলগত জলপথের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন সমীকরণ পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। এই অঞ্চল এখন সামরিক শক্তির দাপট নয়, বরং সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন সামুদ্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
চুক্তি ভঙ্গ ও মার্কিন আগ্রাসন
২০২৬ সালের জুনে পারস্য উপসাগরে নৌ-আচরণ ও পারস্পরিক ‘রেড লাইন’ মেনে চলার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন শুরু থেকেই এই কাঠামোকে উপেক্ষা করে আসছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে ইরানকে কঠোর হুমকি দিয়েছেন।
এর জবাবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মার্কিন আধিপত্যের সামনে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরান এখন জাতিসংঘের সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে আইনসম্মত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে।
আমেরিকার ব্যর্থ সামরিক অভিযান
বর্তমান সংঘাতের তীব্রতা বোঝার জন্য আমেরিকার পূর্ববর্তী দুটি গোপন সামরিক অভিযানের নেপথ্য ইতিহাস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যা মার্কিন পেন্টাগনকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল:
স্থল অভিযানের ব্যর্থতা: ইরাকি কুর্দিদের সহায়তায় আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে একটি স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তুরস্কের গোয়েন্দা সহায়তায় খবরটি দ্রুত আইআরজিসির হাতে চলে যায়। পরবর্তীতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান সরাসরি ট্রাম্পকে চাপ দিয়ে এই সামরিক পরিকল্পনা বাতিল করান।
প্রমাণ লোপাট অভিযান: চলতি বছরের এপ্রিলে একটি মার্কিন এফ-১৫ই বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর, পাইলট উদ্ধার ও পারমাণবিক উপকরণ জব্দের অজুহাতে ইরানি ভূখণ্ডে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু সেখানে তারা আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনীর তীব্র কাউন্টার-অ্যাটাকের শিকার হয়। মার্কিন সেনারা পিছু হটার সময় মূল্যবান সামরিক প্রযুক্তি যেন ইরানের হাতে না পড়ে, সেজন্য নিজেদের বেশ কয়েকটি বিকল এয়ারক্রাফট ধ্বংস করে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
উপকূলীয় যুদ্ধ ও পাল্টা আঘাত
আমেরিকা এখন এই সংঘাতের এক চূড়ান্ত তৃতীয় পর্যায় শুরু করেছে। ওয়াশিংটন ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থলবাহিনী পাঠানোর লক্ষ্যে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূল অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে চাবাহার, কোণারাক এবং বন্দর আব্বাস অঞ্চলে তীব্র আক্রমণ চালানো হচ্ছে, যেন ইরানের সামুদ্রিক আক্রমণের ক্ষমতা কমিয়ে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়।
তবে ইরানও চুপ করে বসে নেই। তারা জর্ডান, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও রাডার সেন্টারে অবিরাম মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে মোলোয়েন করা মার্কিন সামগ্রিক এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া, যাতে পরবর্তীতে ইসরায়েলের দিকে ছোঁড়া মিসাইলগুলো কোনো বাধা ছাড়াই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
১৬২২ সালের হরমুজ ও পর্তুগিজ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
বর্তমান পারস্য উপসাগরে আমেরিকার এই পিছুটান ও ইরানের রণকৌশল দেখে অনেক বিশ্লেষক চারশ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। ১৬২২ সালে সাফাভি শাসনামলে ইরান যেভাবে তৎকালীন সামুদ্রিক পরাশক্তি পর্তুগালের নৌ-আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছিল, আজকের পরিস্থিতি যেন তারই এক আধুনিক সংস্করণ।
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে পর্তুগাল ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য। ১৫০৭ সালে তারা হরমুজ দখল করে পারস্য উপসাগরের পুরো বাণিজ্যপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। শুরুতে ইরান অন্যান্য যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে ইরানি সেনাপতিরা পর্তুগিজদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতাটি চিহ্নিত করেন। তারা দেখেন, পর্তুগিজদের হরমুজ দুর্গটি সামরিকভাবে অভেদ্য মনে হলেও, এর রসদ ও সাহায্য সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল চরম অনিরাপদ এবং বহিরাগত উৎসের ওপর নির্ভরশীল। ইরান কৌশলে সেই সরবরাহ পথ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তৎকালীন উদীয়মান শক্তি ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে নিজেদের পক্ষে যুদ্ধে যুক্ত করে। ফলস্বরূপ, ১৬২২ সালে অবরুদ্ধ হরমুজ দুর্গের পতন ঘটে এবং পারস্য উপসাগর থেকে পর্তুগিজদের দীর্ঘ ১১৫ বছরের আধিপত্যের চিরতরে অবসান হয়।
চারশ বছর পর, পেন্টাগনের আধুনিক যুদ্ধযন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরান ঠিক একই ধরনের সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করার নীতি গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি এবং রণতরীগুলো হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা যে রসদ ও এয়ার ডিফেন্স সাপোর্টের ওপর নির্ভরশীল, ইরান তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঠিক সেই নেটওয়ার্ককেই আঘাত করছে। জর্ডান বা কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের পথ অবরুদ্ধ করা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই ঐতিহাসিক ‘দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা’কে ভেঙে দেওয়ারই আধুনিক কৌশল।
হরমুজ প্রণালীর আইনি ও সামরিক অবস্থান
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকা সংশ্লিষ্ট দেশের আঞ্চলিক জলসীমা। ভৌগোলিক বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালীর দুই প্রান্তে কেবল ইরান ও ওমানেরই উপকূলীয় ভূখণ্ড রয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুলফজল শেকারচি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
সামরিক ভারসাম্যের দিক থেকেও ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক দিমিত্রি করনেভের মতে, ইরানের কাছে অত্যন্ত কার্যকরী মোবাইল উপকূলীয় জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আধুনিক নজরদারি ড্রোন রয়েছে, যা চলন্ত নৌ-লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি পাল্লার মধ্যে পেন্টাগন কখনোই নিজেদের বিলিয়ন ডলার মূল্যের রণতরি মোতায়েন করার ঝুঁকি নেবে না।
বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, টানা সামরিক হামলা ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এই প্রণালী নিজের শর্তে পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো কার্যকর কৌশল নেই। আমেরিকার প্রযুক্তির চেয়ে ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা এবং অসমমিতিক যুদ্ধকৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এক অপমানজনক পিছুটানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লোহিত সাগরের নয়া ফ্রন্ট ও বৈশ্বিক সংকট
এই সংকটের মাঝেই লোহিত সাগর অঞ্চলে আরেকটি বিপজ্জনক ফ্রন্ট খুলে গেছে। সানা বিমানবন্দরে ইরানি বেসামরিক বিমান অবতরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। হুতিরা সৌদির আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালিয়ে ঘোষণা করেছে যে তাদের ‘উত্তেজনা হ্রাস’ পর্যায় শেষ।
যদি ইরান-হুতি অক্ষ একযোগে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই দুটি চোকপয়েন্ট একসঙ্গে বন্ধ হলে বিশ্বের প্রায় ২২-২৫ শতাংশ তেল-গ্যাস সরবরাহ এবং ৩০ শতাংশ কনটেইনার শিপিং সম্পূর্ণ আটকে যাবে, যার ফলে তেলের দাম সহজেই ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপরও। দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হুঁশিয়ারি
সমগ্র এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ওয়াশিংটনকে চরম সতর্কবাণী দিয়ে বলেছেন, ‘সমঝোতা স্মারকের প্রতি ওয়াশিংটনের বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘নির্ভরযোগ্যতাহীন’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, আমেরিকা অঞ্চলে আরও যুদ্ধ উসকে দিলে প্রতিরোধ অক্ষ তাদের কঠোর শিক্ষা দেবে।
নতুন সমীকরণের শেষ কথা
হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে বাব আল-মান্দাব পর্যন্ত বিস্তৃত এই নতুন কৌশলগত সমীকরণ পশ্চিম এশিয়ার পুরোনো মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভৌগোলিক সুবিধা ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির বিরুদ্ধে দূরদেশ থেকে আসা কোনো সামুদ্রিক পরাশক্তিই চিরকাল টিকে থাকতে পারে না—১৬২২ সালে পর্তুগিজরা যা টের পেয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার আধিপত্যবাদী নীতি পরিহার না করে আরও সামরিক উত্তেজনার পথ বেছে নেয়, তবে তাকে এই জলপথে এমন এক বিপর্যয়কর পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হবে, যার চড়া মূল্য পুরো পশ্চিমা বিশ্বসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দিতে হবে।
