রাজধানীতে ডিভোর্স বাড়ছে!

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : অতৃপ্ত যৌনজীবন, পরকীয়া প্রেম, যোগাযোগের অপূর্ন্যতা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাবুঝির অভাব, অহংকার, সন্তান মানুষ করা নিয়ে মতভেদ, নির্যাতন, সংসার কাজে অনীহা ইত্যাদি নানা কারনে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে রাজধানীতে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী তালাকের নোটিস ঢাকার দুই সিটি করর্পোরেশনের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রথমে মেয়রের কার্যালয়ে তালাকের আবেদন নথিভুক্ত হয়। তারপর সেখান থেকে তালাকের আবেদন মূলত স্ত্রী কোন অঞ্চলে বসবাস করছেন সেই অনুযায়ী ওই অঞ্চলের কার্যালয় নোটিস পাঠানো হয়।

ঢাকা দক্ষিন সিটি করর্পোরেশনকে ১০ টি অঞ্চলের মধ্যে আঞ্চলিক (১) নির্বাহী কর্মকর্তা উপ সচিব হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মেরীনা নাজনীন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, পারিবারিক কলহের জেরে বেড়েছে বিচ্ছেদের ঘটনা। ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে গত বছর একই সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে বিবাহবিচ্ছেদ।

আঞ্চলিক (২) এর কর্মকর্তা উপ সচিব সুয়ে- মেন জো বলেন, ২০২০ জুন থেকে ডিসেম্বর এই ৬ মাসে তালাক হয়েছে ৫ হাজার ৯৭০ টি। এই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০১৯ সালে প্রতিমাসে গড়ে তালাক হয়েছে ৯২০ টি।

এ সময়ে আঞ্চলিক কর্মকর্তা বাবর আলী মীর, ও মামুন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় ঢাকা দক্ষিন সিটি করর্পোরেশনের ১০ টি অঞ্চলে চলতি বছরের ৯ মাসে তালাক বেড়েছে ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

সূত্র আরো জানাচ্ছে, তালাকের আবেদন পেলে সিটি করর্পোরেশন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আবেদনকারী ও বিবাদী দুই পক্ষকেই প্রথমে আপসের নোটিস পাঠায়। আপস না হলে । ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনূযায়ী তালাক আবেদন ৯০ দিনের মধ্যে কোনো পক্ষ আপসে না আসলে বা তালাক প্রত্যাহারের আবেদন না করলে তালাক কার্যকর হয়ে যায় ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর(বিবিএস) তথ্য বলছে কয়েক বছর ধরে তালাকের প্রবনতা বাড়ছে। ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রকাশিত বিবিএসের দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে তালাকের ঘটনা বেড়েছে ১৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষঞ্জ অধ্যাপক ডাঃ দেওয়ান আব্দুর রহিম বলেন, পারিবারিক সামাজিক বন্ধন ক্ষীন হচ্ছে দিনদিন। ক্রমশ পারিবারিক মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে। যান্তিক হয়ে যাচ্ছে মানুষ। পরিবার সন্তান ও স্বামী স্ত্রীর উপর, স্ত্রী স্বামীর উপর সম্মান, শ্রদ্ধা আস্থা বিশ্বাস, ভালোলাগা ও ভালোবাসা কাল ক্রমে যাচ্ছে কমে। হ্রাস পেয়েছে মনের প্রতি মনের টান, ফলে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ।

ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে- ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতি বছর ৬ হাজার ৫০০ টির মত ( আনুমানিক) বিবাহবিচ্ছেদ এর ঘটনা ঘটে।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তালাক রেজিস্ট্রি দপ্তর, এবং ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের আইন কমকর্তা উপ-সচিব মোঃ খায়রুল হাসান জানান, দিন দিন ভয়াবহ আকারে বেড়ে চলেছে বিবাহবিচ্ছেদ। ঢাকায় এর প্রবনতা ভয়ংকর রুপ নিয়েছে। এই তালিকায় সব শ্রেনীর পরিবারের পাশাপাশি প্রভাবশালী ও তারকা পরিবার ও রয়েছে।বিচ্ছেদের দুই তৃতীয়াংশ নোটিসই আসছে নারীর কাছ থেকে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ মানষিক রোগ বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের নেপথ্যে নানা কারন হতে পারে। মনোবিঞ্জানীদের মতে পারিবারিক নির্যাতন, মাদকাসক্ত, সন্দেহ প্রবনতা, একে অপরের মর্যাদা বৃদ্ধি কম বা বেশী মনে করা, স্বাধীনচেতা ও শূন্যতা বিরাজকরা, তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার, পরকীয়া , ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারনে বিবাহবিচ্ছেদ এর অন্যতম কারন বলে জানান।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক মনোরোগবিজ্ঞান বিভাগ এর ডাঃ মোঃ সাব্বির রহমান ও হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিঞ্জান এর সহযোগী অধ্যাপক –ডাঃ ফারজানা রবিন বলেন, বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদের পিছনে অন্যতম কারন হতে পারে অতিমাত্রায় আধুনিক জীবনযাপন।

বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার লিমিটেডের এক বিবৃতিতে জানান, আমাদের বন্ধনটা দুর্বল হচ্ছে। পাশাপাশি নারীরা সাবলম্বী হচ্ছেন। অনেক নারী আগে অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও স্বামীর সংসারে থাকতেন। কিন্তু এখন তারা সিন্ধান্ত নিতে পারছেন। স্বামী স্ত্রীকে সময় না দেয়ার কারনে স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। সেখানে কারো সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। এক পর্যায়ে পরকীয়ার সর্ম্পক লিপ্ত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিয়ে গড়াচ্ছে তালাকে।

ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোঃ আকরামুজ্জামান ও জনসংযোগ কমকর্তা মোঃ আবু নাছের জানান, সিটি কর্পোরেশনের ১০ অঞ্চলের হিসাব মতে ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজধানীতে ৪১ হাজার ৭০৩ টি বিবাহবিচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নোটিস কার্যকর হয়েছে ২৯ হাজার ৯৫৫টি। এ সময়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তালাকের নোটিস দেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার এর মতো। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৫ টি মাসে ৪৫০টি এবং বছরে ৩৬৫ দিনে ৫ হাজার ৪৭৫ টি সংসার ভেঙ্গেঁ যাচ্ছে।

তালাকের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করে দেখা গেছে মূলত উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে বিচ্ছেদবেশী হয়েছে। যাদের অধিকাংশের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিয়ের এক বছরের মধ্যে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে আসা পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। গত ৮ বছরে দুই সিটি এলাকায় বিচ্ছেদ কার্যকর হয়েছে ৩২ হাজারের অধিক।

এ ব্যাপারে সমাজবিঞ্জানীরা বলছেন, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ কারও কথা শুনতে চাননা। ইচ্ছে মতো চলাফেরা করেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরা মনে করেন অঢেল অর্থ সম্পদ রয়েছে তাই বিচ্ছেদ হলে সমস্যা হবে না ।

আর নিম্নবিত্ত পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রত্যাশা প্রাপ্তির বিরাট ফারাক থাকে। বেশীর ভাগ পরিবারের নারীরা চাহিদা অনুযায়ী অনেক মৌলিক আবদার বুঝে পান না। ফলে অভাব অনটন সব সময় লেগেই থাকে। ফলে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয় । অন্যদিকে মধ্যেবিত্ত পরিবারের সদস্যরা লোকলজ্জার ভয়ে সাধারনত ঘর ভাঙ্গতে রাজি হন না।