
বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার বঙ্গভবনের দরবার হলে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের কাছে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল।
শপথ গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নতুন রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান। এরপর দুজন নিজেদের চেয়ার বদল করেন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও অতিথির সারিতে ছিলেন।
বঙ্গভবনের দরবার হলের মঞ্চে ছিল তিনটি আসন। মাঝের আসনে বসেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর এক পাশে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অন্য পাশে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। তাঁরা এবং অনুষ্ঠানের অতিথিরা নিজেদের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালে ব্যান্ড দলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
এরপর আসন গ্রহণ ও শপথ অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি প্রার্থনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য অনুরোধ জানান। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান।
শপথের পর মির্জা ফখরুল শপথনামায় স্বাক্ষর করেন। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তা সত্যায়ন করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভায় যুক্ত চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীকে শপথ করান।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বঙ্গভবন। তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামীকাল রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
শপথ অনুষ্ঠানের পর দরবার হলের উত্তর পাশে ক্রেডেনশিয়াল অতিথিদের মাঠে চা-চক্রের আয়োজন করা হয়। সেখানে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
চা-চক্র শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের সময় মির্জা ফখরুলের ভূমিকার স্মৃতিচারণা করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যে সময়টাতে ফ্যাসিবাদরীরা আমাদের হাঁটতে দেয় নাই, বসতে দেয় নাই, বলতে দেয় নাই—সেই সময়টাতে বহুবার আমরা (বিএনপি-জামায়াত) বিভিন্ন জায়গায় বসতাম। সেই লোকটাই (মির্জা ফখরুল) আজকে রাষ্ট্রপতির জায়গায় এসেছেন। এটা আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আনন্দের বিষয়।’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সৎ, যোগ্য মানুষ। একটি নির্বাচিত সরকার সংসদে নির্বাচন করে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছে স্বচ্ছতার মাধ্যমে। যেটা গণতন্ত্রের মেজর স্পিরিট। যেটার জন্য মানুষ এত ত্যাগ স্বীকার করেছে। এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।’
শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলে অতিথিদের প্রথম সারিতে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও সামনের সারিতে ছিলেন।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীমও শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ ছাড়া ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও মানবজমিন–এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ, ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ, মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ও মির্জা ইকবাল আমিনও শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ছিলেন। মির্জা ফখরুলই বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘকালীন মহাসচিব।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) সঙ্গে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হন মির্জা ফখরুল। পরে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নামেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রথমে নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। দলটির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতি এবং সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তিনি তখন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
