
বিশেষ প্রতিবেদক: ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার সাভার -আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ৫২৯ টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
শিল্প পুলিশ-১ এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া আজ রোববার বিকালে বলেন, “সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি তৈরি পোশক কারাখানা আজকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।” এ ছাড়া বিকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক মিলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন। এ কারণে ওই পথে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। পুলিশ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান শিল্প পুলিশের কর্মকর্তা মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
শিল্প পুলিশ-২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, রোববার সারা দিনে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের মধ্যে দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি কারখানার গুদাম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার সকাল থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুর ১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়, যা চলে প্রায় দুপুর ২টা পর্যন্ত। এ সময় মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দুপুরের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মিরপুর ১০, মিরপুর ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সড়ক ও রেল—দুই পথেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়। মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করে পুলিশ। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও বাঁশি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম। আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর বাহিনীটি ২৮ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিল্পাঞ্চল পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আশুলিয়ায় অধিকাংশ পোশাক কারখানায় কাজকর্ম স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানা ও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন।
সকাল ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের একটি কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। তারা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এক পর্যায়ে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে এক পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তারা শারমিন গ্রুপের শ্রমিকদের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শারমিন গ্রুপের কারখানা ছুটি ঘোষণা করে মালিকপক্ষ। একই এলাকায় হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজ গ্রুপসহ আরও কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, সকালে কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন। তবে তিনটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখেন। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অনেক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, কারখানা ছুটির প্রকৃত সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।
রোববার দুপুরে মিরপুরে আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ হবে। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও তারা সড়ক ছাড়ছিলেন না। পুলিশের কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি। কাউকে আটকও করা হয়নি। পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া এবং তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, সড়ক পরিষ্কারের সময় পুলিশ ওই এলাকায় মনোযোগ দিয়েছিল। কারও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।
এর আগে, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সকাল থেকে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। এতে ওই এলাকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। মিরপুর-১১ নম্বরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা।
