
গাজী আবু বকর : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা ঋণ চুক্তি থেকে সরকার সরে এসেছে। এখন জনস্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই নতুন কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে আইএমএফের কোনো কর্মসূচীতে অংশ নেবে না সরকার। আজ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন।
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে ঢাকায় আসা ১২ সদস্যের আইএমএফ প্রতিনিধিদল রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ও কবির আহাম্মদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে আলোচনার সূচনা করেন। সেখানে আধা ঘণ্টার মত বৈঠক করে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ে যান। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থার মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশের চলমান রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য আইএমএফের অর্থায়ন পাওয়া নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সংরক্ষণই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে এমন একটি নতুন কর্মসূচির দিকেই সরকার এগোচ্ছে। যে কর্মসূচিতেই যাওয়া হোক না কেন, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের নেওয়া আইএমএফ-এর আগের কর্মসূচিটি ছিল সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী। সেই কর্মসূচিতে এমন অনেকগুলো শর্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কারণেই বর্তমান সরকার পূর্বের প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী দেশের চলমান রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এসময় তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা বাড়াতে বর্তমান ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনা হবে। তিনি বলেন, একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের বর্তমান ভিসা নীতি রিভাইজ বা সংশোধন করা দরকার। এই নীতিকে আরও সহজ ও আধুনিক করা হবে। বাংলাদেশের ভিসা নীতি আধুনিকীকরণের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভিসা নীতি আধুনিকীকরণের ফলে দেশে বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ওপর আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হবে।
ব্রিফিং চলাকালে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
এদিকে সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে অর্থমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া আইএমএফ-এর আগের প্রোগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন বা ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন বা ৩৬৪ কোটি ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। শর্ত পূর্ণ না হওয়ায় ষষ্ঠ কিস্তির অবশিষ্ট অর্থ আইএমএফ ছাড় করেনি। সরকারও এখন আর ওই কর্মসূচিতে থাকতে আগ্রহী নয়। তার বদলে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চেয়ে গত জুন মাসে আবেদন করে বাংলাদেশ। এর আওতায় তিন বছরে ৪ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী এর আগে একাধিকবার বলেছিলেন, আগের ঋণ কর্মসূচি নেওয়ার সময়ের অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা বদলে গেছে। রাজনৈতিক পালাবদল, অর্থনীতির নীতিগত কাঠামো পরিবর্তন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, যা নতুন করে বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সরকার।
