
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধনের প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। তবে সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী যুক্ত করা হলেও প্রতিটি নির্বাচনে তাদের মোতায়েন বাধ্যতামূলক হবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা হবে।’ সোমবার (১৩ জুলাই) নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এসব তথ্য জানান।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন ২০০৯ অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় পুলিশ বাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব), আনসার বাহিনী, ব্যাটালিয়ান আনসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং কোস্টগার্ড বাহিনী থাকলেও ছিল না সেনাবাহিনী। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধনের প্রস্তাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী যুক্ত করতে যাচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।
আগামীকাল অথবা পরশুদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধি সংশোধনে বৈঠক করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে কী কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা কিছু পরিবর্তন করছি। এই বিষয়ে আগামীকাল বা পরশু মিটিং হতে পারে। মোটা দাগের পরিবর্তন বললে— অনেকগুলো সংজ্ঞায় পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীও আসতে পারে। স্থানীয় সরকারের কয়েকটিতে সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কয়েকটিতে নেই। যেখানে নেই, সেখানে এটা আমরা অন্তর্ভুক্ত করবো। জেলা পরিষদ ছাড়া বাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমরা এটা যোগ করতে পারি।” তিনি বলেন, “দুই-এক জায়গায় আগে থেকেই সেনাবাহিনী সংজ্ঞায় যুক্ত আছে। এখন সব জায়গায় আমরা এটা নিয়ে আসছি। শুধু জেলা পরিষদ বাদে। কারণ জেলা পরিষদে ডিরেক্ট নির্বাচন হয়না।”
এদিকে দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ইতিহাস নেই। আইনেও সব জায়গায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা উল্লেখ নেই। সেক্ষেত্র আইনের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকবে কিনা জানতে চাইলে রহমানেল মাছউদ বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকবে না। আমরা মোতায়েন করতে বাধ্য না। তবে সংজ্ঞায় পরিবর্তন করলাম। তাদের সংজ্ঞাভুক্ত করা হবে। প্রয়োজন হলে নেবো, প্রয়োজন না হলে মোতায়েন করবো না।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, সারাদেশে ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে ছিল নির্বাচনি পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে। এর মধ্যে সেনবাহিনীর সদস্য থাকে ১ লক্ষ ৩ হাজার।
আগামী একবছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন— এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সরকারের। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার নির্বাচন দিয়ে শুরু করতে পারে কমিশন।
এর আগে এই প্রসঙ্গে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, “আমরা বলেছি যে, কোন ইলেকশন বেশি প্রয়োজন— এখন সবগুলো পেন্ডিং, সবগুলোতো একত্রে করা যাবে না। কোনটা বেশি দরকার? মানুষের উপকার কোথায় বেশি হয়? কোথায় মানুষ অসুবিধা ভোগ করছে? সরকারের সঙ্গে এসব বিষয়ে আমাদের কিছু আলাপ আলোচনা হবে এবং তার ভিত্তিতেই আমরা নির্বাচনের সব ধরনের তফসিল ঘোষণা করবো।”
কোন নির্বাচনে আগে হবে এই বিষয়ে তিনি বলেন, “সব প্রতিষ্ঠান খালি আছে। আইনের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। সব নির্বাচন যেহেতু একত্রে আসছে, তাই আইনের বাধ্যবাধকতা পালন ওইভাবে সম্ভব হবে না। তবে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি যাতে নির্দিষ্ট সময়ে সব নির্বাচন সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করতে পারি। তবে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও পৌরসভা থেকে নির্বাচন শুরু হওয়া বাস্তব ক্ষেত্রে অধিক যৌক্তিক। অপরদিকে সিটি করপোরেশনতো প্রশাসক দিয়ে চলছে।”
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সারাদেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদের। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। এছাড়া মামলা, সীমানা জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়নি ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদের।
রোডম্যাপে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৯৮১টি পরিষদ। এছাড়া ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে অন্যগুলো।
পৌরসভার রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সারাদেশের মোট পৌরসভা রয়েছে ৩৩০টি । এর মধ্যে নির্বাচন উপযোগী ৩২০টি। আর সীমানা জটিলতা-ভোটার তালিকা প্রণয়ন-মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী নয়।
উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, নতুন গঠিত হওয়া ৫টি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। এগুলোর মধ্যে কোনটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলো নির্বাচন উপযোগী।
চলতি বছরে নতুন যে ৫টি উপজেলা সৃষ্টি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেগুলো হলো— বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভাগ করে ‘মোকামতলা’, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ভাগ করে ‘মাতামুহুরী’, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ উপজেলা।
সিটি করপোরেশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। এর মধ্যে নতুন যুক্ত হয়েছে বগুড়া সিটি করপোরেশন। বলা হয়েছে, কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলো নির্বাচন উপযোগী।
এসময় স্থানীয় সরকারের ভোটকেন্দ্র বিষয়ে ইসি আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটা করে ভোট কেন্দ্র থাকবে। অক্টোবর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো শুরু হবে বলে আশা করি।”
এসময় তিনি আরও জানান, অনেক পরিবর্তন আরও কিছু আসতে পারে। যেমন স্কুলের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে এমন বিধান বিধিতে রাখা হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অংশ নিতে পারবেন না। আমরা এই ব্যাপারে একটা প্রস্তাব করতে যাচ্ছি।
