
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : সচিবালয়ের কক্ষ বদলেছে, নামের তালিকা বদলেছে, ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ পদোন্নতিও পেয়েছেন। কিন্তু বদলি, পদায়ন, ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষমতা এখনও প্রায় একইভাবে সরকারের হাতে। ফলে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সরকার। এই দুই সরকারের পর্ব পেরিয়েও প্রশ্নটি রয়ে গেছে। প্রশাসনে বৈষম্য কমেছে, নাকি শুধু সুবিধাভোগী ও বঞ্চিতদের তালিকা বদলেছে?
চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পালাবদল শেষ হয়। কিন্তু সচিবালয়ের বারান্দায় এখনও ঘুরেফিরে শোনা যায়—‘পছন্দের কর্মকর্তা’, ‘বঞ্চিত’, ‘ওএসডি’, ‘চুক্তি’, ‘ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি’ ও ‘ক্যাডার-বৈষম্য’ শব্দগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মনে করেন, বৈষম্য কমেছে কিনা, তা শুধু কতজন পদোন্নতি পেলেন— এ হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। দেখতে হবে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, বদলি, শাস্তি, ওএসডি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টনের নিয়ম কতটা প্রকাশ্য, পূর্বনির্ধারিত ও আপিলযোগ্য হয়েছে।
প্রবেশপথে পরিবর্তন হলেও চাকরিজীবনে পুরোনো ঝুঁকি
জুলাই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অর্জন হয়েছে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের শুরুতে। ২০২৪ সালের ২৩ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সরাসরি নিয়োগে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণের বিধান করা হয়। বাকি সাত শতাংশের মধ্যে পাঁচ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান, এক শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য রাখা হয়। যোগ্য প্রার্থী না মিললে কোটার পদও মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা যাবে। এটা সুযোগের সমতায় বড় অগ্রগতি। তবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ মানেই মেধাভিত্তিক প্রশাসন নয়। একজন কর্মকর্তা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ঢোকার পর তার বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি যদি অস্বচ্ছ বিবেচনায় নির্ধারিত হয়, তাহলে প্রবেশপথে অর্জিত সমতা চাকরিজীবনের পরবর্তী ধাপে হারিয়ে যেতে পারে।
পুরোনো বঞ্চনার প্রতিকার, প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল বিগত সরকারের সময়ে পদোন্নতিবঞ্চিত বলে বিবেচিত কর্মকর্তাদের প্রতিকার দেওয়া। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাওয়া ৭৬৪ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১১৯ জন সচিব, ৪১ জন গ্রেড-১ কর্মকর্তা, ৫২৮ জন অতিরিক্ত সচিব, ৭২ জন যুগ্ম সচিব এবং চারজন উপসচিব পদমর্যাদা পান। প্রায় দেড় হাজার আবেদনের মধ্য থেকে পর্যালোচনা কমিটি তাদের বিষয়ে সুপারিশ করেছিল।
দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কারণে আটকে থাকা কারও জ্যেষ্ঠতা, মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের অংশ। কিন্তু কে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত ছিলেন, কার পদোন্নতি পেশাগত রেকর্ড বা বিভাগীয় কারণে থেমেছিল এবং কোন প্রমাণে প্রতিকার দেওয়া হলো—এসবের কোনও ব্যাখ্যা নাই। ফলে বঞ্চনা নিরসনের উদ্যোগই নতুন বঞ্চনার অভিযোগ তৈরি করেছে।
প্রশাসনের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, পুরোনো সরকারের রাজনৈতিক আস্থার জায়গায় নতুন রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা যেন মানদণ্ড হয়ে না ওঠে, তার কোনও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ তৈরি হয়নি। অর্থাৎ অন্যায় সংশোধন হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে একই অন্যায় ঠেকানোর স্বাধীন ও আপিলযোগ্য ব্যবস্থা হয়নি।
পদ ছাড়াই পদোন্নতি
পদোন্নতির সংখ্যার সঙ্গে অনুমোদিত পদের সামঞ্জস্য না থাকাও একটি বড় সমস্যা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ ছিল ৫০২টি। অথচ ওই পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন ১ হাজার ২৭ জন। ফলে পদোন্নতির পরও বহু কর্মকর্তা আগের দায়িত্বেই থেকে যান। বদলেছে মূলত পদমর্যাদা, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা।
নতুন বিএনপি সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় ১৭৯ উপসচিবকে যুগ্ম সচিব করেছে। ১৭২ জনকে একটি প্রজ্ঞাপনে এবং আরও সাতজনকে পৃথক প্রজ্ঞাপনে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এটি নির্বাচনের পর নতুন সরকারের প্রথম বড় প্রশাসনিক পদোন্নতি। কিন্তু কতটি কার্যকর শূন্য পদের বিপরীতে এই পদোন্নতি, বাছাইয়ের তুলনামূলক মানদণ্ড কী এবং পদোন্নতির পর কর্মকর্তারা কোথায় দায়িত্ব পাবেন, সেসব জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শূন্য পদ ছাড়াই পদোন্নতি কর্মকর্তাদের ক্ষোভ সাময়িকভাবে কমাতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোকে ভারী করে। এতে দায়িত্ব ও পদমর্যাদার সম্পর্ক দুর্বল হয়, বেতন-সুবিধার ব্যয় বাড়ে এবং কর্মদক্ষতার বদলে চাপ বা গোষ্ঠীগত দর-কষাকষি ফলপ্রসূ হয় বলে ধারণা তৈরি করে।
ক্যাডার-বৈষম্যের মূল সমস্যা অক্ষত
প্রশাসনের গভীরতম বৈষম্যের একটি হচ্ছে, বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে সুযোগ ও ক্ষমতার অসমতা। বর্তমানে উপসচিব পদের প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডার এবং ২৫ শতাংশ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য। সংস্কার আলোচনায় ৫০ অনুপাত ৫০ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাভিত্তিক ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ গঠনের প্রস্তাব এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা কোটা তুলে দিয়ে উন্মুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন।
এ বিরোধ শুধু পদোন্নতির নয়, কোন মন্ত্রণালয়ে কার পেশাগত নেতৃত্ব থাকবে, নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞ ক্যাডারের ভূমিকা কতটুকু এবং প্রশাসন ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণ কতটা সীমিত হবে, এসবের সঙ্গেও যুক্ত। অন্তর্বর্তী সরকার গিঁটটি খুলতে পারেনি। নতুন সরকারও এখনও পর্যন্ত এই কাঠামো বদলায়নি। আলামতও নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে ৭৩ সচিবের মধ্যে ২০ জন চুক্তিতে কর্মরত ছিলেন। প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা– তাদের মধ্যে ১৪ জন সচিব, ওএসডি হন। অন্তত ১৫০ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অথচ সংস্কার কমিশন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ওএসডি, ২৫ বছর পর বাধ্যতামূলক অবসর এবং অতিরিক্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছিল।
নতুন সরকার এসে অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৯ জন চুক্তিভিত্তিক সচিবের চুক্তি বাতিল করে। এরপর অন্তত ৭ জনকে সচিব বা সমমর্যাদার পদে নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। গত মার্চ মাসের হিসাবে ৬৫ সচিবের ১৬ জনই ছিলেন চুক্তিভিত্তিক।
এখানেই বৈষম্যের বড় বৈপরীত্য। এক সরকারের পছন্দের চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা পরের সরকারের কাছে অনুপযুক্ত। আবার নতুন সরকারের পছন্দের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিয়োগকে বলা হয় প্রশাসনিক প্রয়োজন। এতে নিয়মিত ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ সংকুচিত হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নারী প্রান্তিক প্রতিনিধিত্ব
২০২৫ সালের মার্চে মাঠ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনে ১৮ নারী জেলা প্রশাসক, ১৫৮ ইউএনও এবং ১৪ নারী সচিব বা সিনিয়র সচিব দায়িত্বে ছিলেন। এটি দৃশ্যমান অগ্রগতি। তবে নারী নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন বা পদভিত্তিক সমতা-সূচক প্রকাশ করা হয় না। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কেও হালনাগাদ, স্তরভিত্তিক তথ্য সহজলভ্য নয়। ফলে কয়েকজন কর্মকর্তার বদলি বা অবসরের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বের চিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। চাকরির শুরুতে সংরক্ষণ থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক নীতি এখনও দুর্বল।
১৮ জরুরি সুপারিশের তিনটিতে অগ্রগতি
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ৪৫টি সভা ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ শ্রেণিতে ২০০টির বেশি সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে সরকার ১৮টিকে অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। টিআইবির পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেড় বছর পর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে মাত্র তিনটিতে। পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়া, সরকারি দফতরে গণশুনানি এবং মহাসড়কের পেট্রলপাম্পে শৌচাগার সংস্কার। অর্থাৎ নাগরিকসেবার কয়েকটি ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন এলেও পদোন্নতি, পদায়ন, ক্যাডার পুনর্বিন্যাস, স্বাধীন স্থায়ী জনপ্রশাসন কমিশন, ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মতো ক্ষমতা-বণ্টনের সংস্কার আটকে আছে।
‘কাঠামো তো আগের মতোই’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘বৈষম্য কমবে কীভাবে? বৈষম্য তৈরির যে কাঠামো আগে ছিল, সেই কাঠামোতে কি কোনও পরিবর্তন এসেছে? এটি আগের মতোই রয়ে গেছে। বরং দিন দিন বৈষম্য আরও বাড়বে। ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’র যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু রয়েছে, সেই রাজনীতি বহাল থাকলে বৈষম্য কমার কোনও কারণ নেই।’’
প্রশাসনে বৈষম্য নিয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সাবেক সচিব আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী কোনও মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
