
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : শিল্পাঞ্চলে অব্যাহত গ্যাস–সংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন ময়মনসিংহের শিল্পমালিকেরা। গ্যাসের অভাবে কারখানায় মেশিন বন্ধ থাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার জেলার ২০টি কারখানার শ্রমিকদের দুপুরের মধ্যে ছুটি দেওয়া হয়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অন্যান্য কারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোয় উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার আনছার উদ্দিন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে ২৯৩টি শিল্পকারখানা আছে। এর মধ্যে ৯৯টি গ্যাসচালিত। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গ্যাসচালিত
কারখানাই সংকটে পড়েছে। জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আংশিক উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে সার্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এদিকে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের পিডিবি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন স্থানীয় লোকজন। এ সময় পিডিবির এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস-সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টেক্সটাইল ও সুতা তৈরির কারখানাগুলো। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টিই বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাকি সাতটি মেশিন পিডিবির বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হচ্ছে। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমেছে।
এ ছাড়া বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সে উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় ৪০ শতাংশ মেশিন বন্ধ আছে। সিরামিক খাতের এক্সিলেন্ট সিরামিকসের ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমেছে।
শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল বলেন, সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। সাধারণত কারখানাগুলো সকাল থেকে বিকেল ৫টা/৬টা পর্যন্ত চলে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় দুপুরের খাবারের সময় মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল, বিএসপি স্পিনিং মিলসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে মাহাদি সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ কেটে দেন। সুলতানা সোয়েটার্স ও বিএসপি স্পিনিং মিলস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভালুকার গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের ইউটিলিটি বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ বলেন, দেড় থেকে দুই মাস ধরে গ্যাসের চাপ কম। কারখানাটিতে গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এতে উৎপাদন ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমেছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ময়মনসিংহের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) শামীম হোসেন বলেন, ভালুকা এলাকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআইয়ের (গ্যাসের চাপ মাপার একক) দুটি পৃথক লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে তাঁরা ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন।
ঈশ্বরগঞ্জে পিডিবি কার্যালয়ে হামলা
ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার কারণে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের পিডিবি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন একদল মানুষ। গতকাল বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনার পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দ্রুত ট্রান্সফরমার স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষুব্ধ লোকজন সেখান থেকে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৩ আগস্ট রাতে পৌর এলাকার শিমরাইল গ্রামের একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়। এর পর থেকে গ্রামটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ। এতে কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে গ্রামের ২০০ থেকে ২৫০ বাসিন্দা পিডিবি কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ড্রয়ার ভাঙচুর করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সজিব মিয়া ও নূরুল হকের অভিযোগ, নতুন ট্রান্সফরমার দেওয়ার কথা বলে পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলীকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহেও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
তবে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিডিবির উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম। হামলায় আহত এই কর্মকর্তা বলেন, ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে লাইনের সংযোগ ও মেরামতের কাজে লাইনম্যানদের কিছু খরচাপাতি সব জায়গায় দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় এক মাস আগেও একই গ্রামের ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছিল। তখন নতুন ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে পুরোনো একটি ট্রান্সফরমার দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সেটিও নষ্ট হয়ে যায়। বারবার পুরোনো ট্রান্সফরমার দেওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
পিডিবি ঈশ্বরগঞ্জের আবাসিক প্রকৌশলী হামজা ইমাম বলেন, শিমরাইল গ্রামের ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ট্রান্সফরমারের সংকট থাকায় নতুন ট্রান্সফরমার পেতে দেরি হয়েছে।
