মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকিতে অর্থনীতি

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে মন্থরতার পাশাপাশি রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয়ের মাসভিত্তিক প্রবাহে গতি কমেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে অস্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। এর সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ফের মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে; আবার রাজস্ব আয় কম থাকায় সরকারের ঋণনির্ভরতাও বাড়ছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে এখনও বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা থাকলেও বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতির মতো অভ্যন্তরীণ সূচকে চাপ রয়ে গেছে। রপ্তানিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তা ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে; ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ছাড়া বিনিয়োগ এবং ঋণপ্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে না। একইসঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর ওপরও জোর দিতে হবে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এই দুই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। একই সঙ্গে গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং আদায় ব্যবস্থায় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগছে।

সরকারের আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে ব্যয়ের চাপ থাকায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকার সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর এই তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে আরও প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানো গেলেও বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু দেশীয় উৎস নয়, বাজেট সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়নে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও নতুন ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছিল। আগস্টে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হলেও তা ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি অনেক কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বিনিয়োগের মন্থর চাহিদা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে কমেছে মাসভিত্তিক গতি: বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি আগের মাস আগস্টের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি ডলার কম। তবে গত বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। এর আগে সর্বনিম্ন ২৫৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। এদিকে জুলাই-সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলার, যা আগের মাস আগস্টের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ কম। তবে এটি গত বছরের একই মাসের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এদিকে জুলাই-সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।

সর্বশেষ আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে এখনই টেকসই বলে মনে করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, দেশে জ্বালানির দামে সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় কর্মকর্তাদের নতুন বেতন কাঠামোর মতো বিষয়কে মূল্যস্ফীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণে আগামী দিনে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। এই ঝুঁকি বিবেচনায় অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকেও নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাব বেসরকারি ঋণের খরচ ও বিনিয়োগের ওপরও পড়ছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে গত কয়েক মাস ধরে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোর বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো অবস্থায় থাকা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। মাসভিত্তিক কমলেও তিন মাসের হিসাবে রপ্তানিও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির কারণে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানো যায়। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ইতিবাবচক। একইসঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ এবং রপ্তানিতে গতি ফেরাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও এর সুফল পেতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রাপ্তিতে নানা সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি বেসরকারি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সম্প্রসারণেও সতর্কতা রয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোর গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না; তাই পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বেড়েছে। আগে থেকেই দেশের বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এজন্য ঋণ নেওয়া বেড়েছে। সুতরাং, সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর আয় বাড়াতে হলে রাজস্ব খাতের দিকে নজর দিতে হবে। ভ্যাট-ট্যাক্স কীভাবে বাড়ানো যায়— সরকারকে সে দিকে জোর দিতে হবে।

Share