
নয়াবার্তা প্রতিবেদক: ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ অন্যান্য দাবিতে রাজধানীর মিরপুরসহ সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও কালিয়াকৈর এবং নারায়ণগঞ্জে গতকাল সোমবারও আন্দোলন করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। মিরপুরে গতকাল ফের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়েছে।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সংঘর্ষ হয়েছে।
পুলিশের ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এমন পরিস্থতিতে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সাভার-আশুলিয়ায় ২৬৪ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ ও কালিয়াকৈরে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
মিরপুরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর : পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল সকালে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ অন্যান্য দাবিতে কাফরুল থানার মিরপুর ১৪ নম্বর ও বিআরটিএর সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ছোড়া হয়।
সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে মিরপুর ২ নম্বর বড়বাগ এলাকার সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ও দেশওয়ান এ্যাপারেলস নামে দুটি পোশাক কারখানায় ভাঙচুর করা হয়।
এ ঘটনার পর প্রতিষ্ঠান দুটিকে প্রধান ফটক সাময়িক বন্ধের ঘোষণা দিয়ে একটি লিখিত কাগজ টাঙিয়ে দিতে দেখা গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, মিরপুর ১৪ নম্বর ও বিআরটিএর সামনে সড়ক অবরোধ করা শ্রমিকদের পুলিশ ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
ডিবি বলছে, মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
গাজীপুরে পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষ, পুলিশের তিন গাড়ি ভাঙচুর-আগুন : গাজীপুরে গতকাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। এরপর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে সকাল ১১টার দিকে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন।
দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় টিভির প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এর আগেও একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, আজও (গতকাল) শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ভোগড়া, কোনাবাড়ী, মৌচাক ও চন্দ্রা এলাকার দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বিজিবি, জেলা ও মহানগর পুলিশ এবং শিল্প পুলিশের হস্তক্ষেপে দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গুজবে কান না দিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ না নিতে সোমবার জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে মসজিদের মাইক থেকে আহবান জানানো হয়েছে। দুপুরে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা মাইকে ওই অনুরোধ জানান।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রমিকদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। মজুরি বোর্ডকে সম্মান জানিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফিরতে চাচ্ছেন; কিন্তু একটি মহল ভুল বুঝিয়ে তাঁদের আন্দোলনে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। তাই উসকানিতে কান না দিতে অনুরোধ জানিয়ে মসজিদে মসজিদে মাইকিং করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাভার-আশুলিয়ায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, ২৬৪ কারখানায় ছুটি, কাভার্ড ভ্যানে আগুন : শিল্পাঞ্চল সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন ও সড়কে বিক্ষোভ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ এবং নরসিংহপুর এলাকায় হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেন্ডে নিক্ষেপ করে। উভয় পক্ষের সংঘর্ষ চলাচালে শিল্প পুলিশের এক সহকারী পুলিশ সুপার ও সাধারণ শ্রমিকসহ আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। নিরাপত্তার স্বার্থে সাভার ও আশুলিয়ার ২৬৪ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, সকালে পোশাক শ্রমিকরা নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে পুলিশ বুঝিয়ে তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। কারখানায় ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সোমবার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় ২৬৪ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে ৪ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ : ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় চার ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের ফলে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট ও চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।
শ্রমিকদের এই অবরোধের ফলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের উভয় পাশে গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এতে দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ পথচারী ও অফিসগামী যাত্রীরা।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং বিকেল সাড়ে ৪টার সময় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
