
নয়াবার্তা প্রতিবেদক: পোশাক শ্রমিক আন্দোলনে অস্থিরতার বিষয়ে গোয়েন্দাদের কাছে আগাম তথ্য ছিল বলে জানা গেছে। এর পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যথাযথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া ও নাশকতার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনসংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে।
তিনি বলেন, এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে এ অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
মাহদী আমিন বলেন, একটি চিহ্নিত মহল গার্মেন্টসশিল্পকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। গতকাল দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে এ কথা বলেন মাহদী আমিন।
ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকাসহ অন্যান্য দাবিতে গত কয়েক দিনে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে।
এসব ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১১টি মামলায় ১০ হাজারের বেশি লোককে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার শতাধিক।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব এলাকার সাড়ে ছয় শর বেশি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এর মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কারখানা চালু রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
পোশাক কারখানা মালিকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উর্ধ্বতনদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলন এখন চলছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এখন যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা করছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠনের, সেটি গঠন করা হয়েছে।
গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ডের জন্য শ্রমিকরা কখনো সড়ক-মহামসড়ক অবরোধ করেননি। গত কয়েক দিনে আন্দোলনের ফুটেজ পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, সেখানে শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের সংযোগ নেই। মুখোশধারী যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা ওখানে অনুপ্রবেশ করেছে। তারাই সড়কের আন্দোলনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে।
এর আগে সকালে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং বিকেলে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গার্মেন্টস মালিকদের বৈঠক: গতকাল সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন গার্মেন্টস মালিক নেতারা। ওই বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে রবিবার মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। শিগগিরই বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে অথবা সম্ভাব্য খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তাঁরা বসবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন যেন শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ হয় এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। শ্রমিকদের বিষয়গুলো যেন অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয়। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে মজুরি নির্ধারিত হবে। এখানে অসন্তোষের কিছু নেই।
গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা শিল্পমালিকদের সহযোগিতা চেয়েছি। তাঁরা আমাদের সহযোগিতা করবেন। সেই সঙ্গে তাঁরা বলেছেন, কিছু শিল্পমালিক আছেন এবং শিল্প-কারখানা আছে, যাঁরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে শিল্প-কারখানা বন্ধ করেছেন। তাঁদের তালিকা তাঁরা আমাদের প্রদান করবেন। এ ছাড়া কিছু কিছু শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এখানে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য পাঁয়তারা করছে, সেসব সংগঠন এবং নামের তালিকাও আমরা তাঁদের সরবরাহ করতে বলেছি।
আগাম গোয়েন্দা তথ্য ও সুপারিশ: শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডিসেম্বরকেন্দ্রিক নাশকতা পরিকল্পনার প্রসঙ্গ এনে গত ১৮ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন গোয়েন্দারা। এ অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সার্বিক পরিস্থিতিকে অধিকতর অস্থিতিশীল ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর আশঙ্কা রয়েছে।
শ্রম অসন্তোষকে উসকে দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আইন-শৃঙ্খলাসহ সার্বিক পরিস্থিতিকে যাতে অস্থিতিশীল না করতে পারে, সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্পাঞ্চল তথা গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলাকারীরা কেউ সাধারণ শ্রমিক নয়। ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নামা নাশকতাকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। গতকাল বিকেলে সাভারের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
১১ মামলায় শতাধিক গ্রেপ্তার: রাজধানীসহ কয়েকটি এলাকায় গত কয়েক দিনের বিক্ষোভের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে ৩০ জন।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মামলার বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা করা হয়েছে। মামলার বাদী পুলিশ। প্রতিটি মামলায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিবি বলছে, মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
কালিয়াকৈরে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে ভাঙচুর, লুটপাট, হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে পুলিশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।
গাজীপুরে তিন মামলায় আসামি চার হাজার, গ্রেপ্তার ৩০: গত রবিবার গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী ও বাসন এলাকায় পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তিনটি মামলা করেছে পুলিশ। আশুলিয়ায় এসব ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নাশকতার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পোশাকশিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা হচ্ছে—জামায়াত আমির: পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
