
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : জঙ্গল সলিমপুরের এম এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের দোকানদার শাহ আলম বিদ্যুতের বিল পান স্থানীয় একটি সংগঠনের রসিদে। ওই সংগঠনকেই তিনি টাকা দেন। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কখনোই তিনি বিল পাননি। গত মার্চে প্রশাসন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার পরও বিল দেওয়ার এ পদ্ধতি বদলায়নি।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এই পাহাড়ি জনপদে এখন পুলিশের তল্লাশিচৌকি আছে, আছে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত টহল দেয়। কিন্তু গত ৪ আগস্ট সরেজমিন দেখা গেল, বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন চালানো বিদ্যুৎ ও পানির বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে। পানির পাম্প ও পাইপলাইন চালানোর টাকা এলাকাভেদে স্থানীয় লোকজনের কাছে দিতে হয়।
আগে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারা থাকত; অপরিচিতদের বিশেষ পরিচয়পত্র দেখাতে হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরের দৃশ্যপট বদলেছে। এখন সেখানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি আছে। মানুষ আগের চেয়ে অবাধে চলাচল করেন, দোকানপাটও খোলা থাকে। প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের আনাগোনা নেই। তবে এর মধ্যেও যৌথ বাহিনী ও র্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। পুলিশ ক্যাম্পের পানির পাইপে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে এখনো পুরোপুরি ভয় কাটেনি।
গত মাসের বিভিন্ন সময়ে আলীনগরের ১৫ বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের আশঙ্কা, এলাকাটির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিন ও তাঁর প্রধান সহযোগীরা গ্রেপ্তার না হলে সুযোগ পেলে আবার সংগঠিত হয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে তাঁরা উচ্ছেদ নিয়েও উদ্বিগ্ন। সরকারের কাছে তাঁদের দাবি, বিকল্প বাসস্থান ব্যবস্থা করে যেন স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের পাহাড়ে ২০ বছর ধরে বসবাসকারী রফিক উদ্দিন বলেন, এত পুলিশ-প্রশাসন থাকার পরও যদি ক্যাম্পে হামলা হয়, তাহলে ভয় তো থাকেই।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, জঙ্গল সলিমপুরে বিদ্যুতের বৈধ মূল সংযোগ মাত্র ২২টি। সেই সংযোগগুলো থেকে অসংখ্য সাবলাইন (শাখা লাইন) ছড়িয়ে বসতিতে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। কোনটি বৈধ, কোনটি অবৈধ এবং কারা টাকা তুলছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাদের কাছে নেই।
পাইলট উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন বাজারে ২০ বছর ধরে দোকান চালান শাহ আলম। তিনি বলেন, ‘সরকারি কোনো বিদ্যুৎ বিল আমরা পাই না। ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নামে কাগজে বিল আসে। এলাকায় তাদের বিদ্যুৎ অফিস আছে। সেখানে নগদ টাকা জমা দেই।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টাকা নেওয়া হলেও পুরোটা সরকারি বিল জমা দেওয়া হয়নি। বকেয়ার কারণে জুলাইয়ে টানা ১৫ দিন এলাকার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আগে ইয়াসিনের লোকজন বিদ্যুতের টাকা সংগ্রহ করত। মার্চে অভিযানের পর প্রকাশ্যে লোক বদলেছে, কিন্তু সংগ্রহের পদ্ধতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি। বাসিন্দাদের হাতে পিডিবির পরিবর্তে স্থানীয় সংগঠনের রসিদ এবং এলাকায় আলাদা ‘বিদ্যুৎ অফিস’ থাকার বিষয়টি সরেজমিনে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২২টি মূল সংযোগের চারটি ইয়াসিনের নামে। বাকিগুলো পুরোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে রয়েছে।
২ লাখ বকেয়া, টাকা গেল কোথায়
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের সংযোগগুলোর বিপরীতে বকেয়া দাঁড়িয়েছিল ৭২ লাখ টাকা। পরে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ২৮ লাখ টাকা দিতে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করায় আবার চলতি মাসের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা ওঠার পরও এত বিল বকেয়া কেন জানতে চাইলে পিডিবি কোনো জবাব দিতে পারেনি। তবে পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের ২২টি সংযোগ প্রায় ২০ বছর আগে নেওয়া। কীভাবে এবং কোন বিবেচনায় এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেটি তাঁর জানা নেই। পিডিবির কর্মীরা এখন বৈধ-অবৈধ সংযোগ যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে পুলিশ ক্যাম্প, পানির পাম্প ও সরকারি কার্যক্রমও বিঘ্নিত হবে। তাই যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, প্রশাসন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও সরকারি ক্যাম্প ও কার্যক্রম অস্বাভাবিক এক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাহলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো?
ক্যাম্পের পানিও স্থানীয় পাইপে
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়মিত জঙ্গল সলিমপুরে যাচ্ছেন এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁদের মধ্যে যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে, সে কারণেই কিছু উদ্যোগ ধীরে ধীরে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুতের মতো জঙ্গল সলিমপুরে কেন্দ্রীয় সরকারি পানি সরবরাহেরও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন গভীর নলকূপ, পাম্প, জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে বসতিতে পানি যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব পাম্প চালানো ও লাইন মেরামতের নামে নিয়মিত টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু কতটি পাম্প আছে, কার জমিতে, কার মিটারে চলে, কত পরিবার ব্যবহার করে এবং টাকা কার কাছে জমা হয়—জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন বা কোনো পানি সরবরাহকারী সংস্থার সমন্বিত হিসাব পাওয়া যায়নি।
আলীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পেও পাশের একটি গভীর নলকূপ থেকে পাইপ দিয়ে পানি আনা হতো। সেই পাইপলাইনে ২৬ জুলাই হামলা হয়। সকালে ট্যাংকের পানি গ্লাসে ঢালার সময় সাদা ফেনা দেখতে পান তিন পুলিশ সদস্য। সেই পানি পান করে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, পানির পাইপ কেটে ভেতরে বিষাক্ত বা কীটনাশকজাতীয় পদার্থ ঢোকানো হয়েছিল। পরে কাটা অংশ প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর দাবি, জঙ্গল সলিমপুর পুলিশ প্রশাসনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। ইয়াসিন, রোকনসহ তাঁদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ পর ক্যাম্পে হামলা
জঙ্গল সলিমপুরে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য ইউনিটের ৩ হাজার ১৭৩ সদস্য বড় যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র, পাইপগান, গুলি, ককটেল, অস্ত্র তৈরির যন্ত্র এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত সিসি ক্যামেরা উদ্ধার হয়। এরপর প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি এবং এস এম পাইলট ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
অভিযানের পর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেছিলেন, জঙ্গল সলিমপুর ‘পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে’। কিন্তু সেই ঘোষণার আড়াই মাসের মধ্যেই ২৪ মে দিবাগত রাত দুইটার দিকে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা হয়। ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে বুলডোজার দিয়ে চৌকির দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে দ্রুত পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য অন্তত চার জায়গায় রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছিল।
৩০টি পাহাড় কেটে প্লট
পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট করা হয়েছে। আলীনগরে আড়াই কাঠার একেকটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং ছোট প্লট প্রায় ৫ লাখ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের ২৩ হাজারই বিক্রি হয়েছে। এসব হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন বা বৈধ দলিল নেই; কিন্তু প্লটের ক্রেতাই পরে স্থানীয় বিদ্যুৎ-পানি ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক গ্রাহকে পরিণত হয়েছেন। এভাবেই জমির অবৈধ বাণিজ্য থেকে সেবা-বাণিজ্য এবং সেখান থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভার কার্যবিবরণীতে জঙ্গল সলিমপুরে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এসব জমিতে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা দখল করে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ করেছে।
চার বছর পর এখন সেই হিসাব বদলে গেছে। বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার হিসাবে, জঙ্গল সলিমপুরে খাসজমি রয়েছে প্রায় এক হাজার একর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৩ হাজার ১০০ একরের আগের হিসাবটি সলিমপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার সম্মিলিত আয়তন হতে পারে।
আগের হিসাব ভুল ছিল কি না, নাকি বর্তমান হিসাবেই ঘাটতি রয়েছে—এর কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। জঙ্গল সলিমপুরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবির মধ্যে সরকারি জমির এই বদলে যাওয়া হিসাবও এখন অমীমাংসিত।
