
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : বিএনপি সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছিল— আসলে কি স্থানীয় নির্বাচন হবে? নাকি প্রশাসক দিয়েই বাকি মেয়াদ পার করা হবে? তবে, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে মুখ খুলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
এ কারণেই নির্বাচনের সুস্পষ্ট তফসিল ঘোষণা না হলেও এখন থেকেই মাঠে নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন তৃণমূলের ভোটার ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে। অনেক জায়গায় একই আসনে রয়েছেন একাধিক শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী। তারা ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দোয়া ও সমর্থন চেয়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের মাধ্যমে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
তবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বেশ সতর্ক ও কৌশলী পদক্ষেপ নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। দীর্ঘদিন পর মাঠপর্যায়ের এই ভোটগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান আরও সুসংহত করাই এখন দলটির মূল লক্ষ্য।
দলের সিনিয়র নেতাদের মতে, যেহেতু স্থানীয় সরকারের এই ভোটগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়া (নির্দলীয়) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলানো। ফলে শুরুতেই তাড়াহুড়ো না করে আগে মাঠ গোছানোর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে এই ভোট উৎসব শুরু হবে; এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। একই এলাকায় দলের একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থী দাঁড়িয়ে গেলে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে দলটির হাইকমান্ড বেশ কঠোর।
নেতারা জানান, তৃণমূলের কোন্দল এড়াতে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি এলাকায় এখন থেকেই ‘একক যোগ্য প্রার্থী’ নির্বাচন বা আপস-সমঝোতা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই নির্বাচনকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করার এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি জোরদার করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে হাইকমান্ড। এছাড়া, নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা হয়ে পড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যাতে ভিন্ন কৌশলে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা ছদ্মবেশে স্থানীয় সরকারে জায়গা করে নিতে না পারে, সেদিকেও রাখা হচ্ছে তীক্ষ্ণ নজর।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে যেমন তারা মরিয়া, তেমনি দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখাটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল।
তিনি বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের। কাউকেই কোনো ধরনের অন্যায় হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদেরও কিছু কিছু জায়গায় ছাড় দেওয়া হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক অভিভাবক ও দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখছেন। অচিরেই একটি শক্তিশালী ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ গঠন করা হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে। দলের নিবেদিতপ্রাণ ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণভাবে অনেক যোগ্য প্রার্থীকেই ইতোমধ্যে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি যেহেতু একটি বড় দল, তাই একেকটি এলাকায় একাধিক প্রার্থী থাকতেই পারেন। তবে, তাদের মধ্যে কীভাবে চমৎকার সমন্বয় করা যায়, সেসব বিষয় নিয়ে শীর্ষ নেতারা কাজ করছেন।”
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘কোনো বিতর্কিত নেতাকে এবার ছাড় দেওয়া হবে না। দলের ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নেতারাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অগ্রাধিকার পাবেন। এর বাইরে কেউ দলীয় নির্দেশ অমান্য করলে, তার বিরুদ্ধে এবার কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
