নতুন করদাতাদের করের আওতায় এনে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে: অর্থমন্ত্রী

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করাই সরকারের লক্ষ্য জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতাদের করের আওতায় এনে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে। আজ ২৯ জুন সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে স্থবিরতা থাকলেও সরকারের চার মাসের বিভিন্ন উদ্যোগে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গতি আসবে এবং আগামী অর্থবছরে এনবিআরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

ব্যয় প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্রমান্বয়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। সে লক্ষ্যে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭.২৭ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করেছি। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছি।

সরকার আগামী অর্থবছরগুলোতে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ আরও বৃদ্ধি করবে এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনবে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে ব্যাপকহারে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে দেশের ঋণধারণ সক্ষমতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। যার ফলে আমাদের ঋণধারণ সক্ষমতার ঝুঁকি নিম্ন থেকে মধ্যম মানে অবনমিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকায়, যা জিডিপির ৩৮.৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২১.৫১ শতাংশ। অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৭.১০ শতাংশ।

সমালোচনার মুখে পুরোনো মালিকদের ব্যাংকে ফেরার ধারা বাতিলের ঘোষণা
বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন । একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পথনকশাও তুলে ধরেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬–এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের বার্তা স্পষ্ট—যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করে। আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা এর শেয়ার ধারক ছিলেন, তাঁরা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এ সুযোগ দিতে পারবে।

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে নতুন ধারাটি যুক্ত করার পর বিতর্ক তৈরি হয়। সংসদে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা কত তুলতে পারবেন

একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের বিষয়ে আজ সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধাও রাখা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে যেসব সংশোধনী

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থ বিলে একগুচ্ছ সংশোধনী আনার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করছাড়, ব্যাংকিং চ্যানেলে সব লেনদেন সম্পন্ন করা কোম্পানিকে অতিরিক্ত করসুবিধা এবং লভ্যাংশের ওপর করহার কমানোর প্রস্তাব। পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ডে কর রেয়াতের জন্য পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, গত মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বড় ঋণগ্রহীতা ছয়টি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ছয় হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমানো, ব্যবসা সহজ করতে ডিরেগুলেশন, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তাঁর ভাষায়, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে সরকার শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছে।

বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে নিহিত। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি ও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানোর ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে।

Share