
বিশেষ প্রতিবেদক : আগস্ট মাস শেষ হতে এখনো ১০ দিন বাকি। এরই মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত জুলাইয়ের হিসাবকেও ছাড়িয়ে গেছে। আগস্ট মাসে আক্রান্তের হার ইতিমধ্যে জুলাইয়ের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত চলতি মাসে ১১ হাজার ৭১২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যেখানে পুরো জুলাই মাসে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ জন। এ মাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২৩, যা জুলাইয়ে ছিল ৩৬।
চলতি বছর এ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ২৭ হাজার ৩৮৮ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৭৭ জন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ জি এম সাইফুর রহমান জানান, সারা দেশে মশা নিধন অভিযান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। এর ফলে আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। এই আবহাওয়া এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য খুবই অনুকূল। এই মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরই বাহক। শীতকালে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে শুরু করবে।’
এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেন এই বিশেষজ্ঞ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারও একই কথা জানান। তিনি বলেন, অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে এবং নভেম্বরে গিয়ে তা কমতে শুরু করবে।
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের বছরগুলোর তুলনায় খুব একটা খারাপ বলা যায় না। এটি অনেকটাই আগের বছরগুলোর ধারায় আছে। তবে আগামী সপ্তাহগুলোয় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে যাবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক বাশার বলেন, অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। নভেম্বরে গিয়ে তা কমতে শুরু করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল বা ‘হটস্পট’গুলোকে পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে চিহ্নিত করে সেখানে দ্রুত মশা নিধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে মশা নিধন অভিযান জোরদার করা, সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি।
জাতীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণে উৎস বা উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা এবং মশার লার্ভা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন তিনি। বিশেষ করে ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান বলেন, তাদের হাসপাতালে এখন প্রচুর ডেঙ্গু রোগী আসছেন। ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত দুটি ওয়ার্ড ইতিমধ্যে রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। অন্য মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বেশির ভাগ রোগীই রক্তচাপ কমে যাওয়া, প্লাজমা লিকেজ এবং শক সিনড্রোমসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসছেন। এ কারণে কাউকেই চিকিৎসা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরানো হচ্ছে না।
টানা জ্বর বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন ডা. নাজমুল আহসান। তিনি বলেন, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই মৃত্যু ও মারাত্মক জটিলতা থেকে বাঁচার উপায়।
তার মতে, সাধারণত জ্বরের তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি গুরুতর রূপ নিতে পারে। তবে প্রাথমিক উপসর্গগুলো অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসের মতোই হতে পারে। তাই জ্বর শুরু হওয়ার পরপরই, তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে এবং জ্বর কমার পরও রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি বা ডায়রিয়া, শরীরে পানি জমা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া অথবা শরীরের কোনো অংশ দিয়ে রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
