আইএমএফের সতর্কবার্তার কারণে আটকে আছে পে-স্কেল

গাজী আবু বকর :  অর্থনৈতিক সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং আইএমএফের সতর্কবার্তার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতির ঘাটতিতে সরকারি কর্মচারীদের নতুন নবম পে-স্কেল আটকে আছে। উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি এখনো নতুন পে-স্কেল কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেনি। এটি জুলাই থেকে কার্যকরের ঘোষণা রয়েছে।বর্তমানে পে-স্কেল চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়ায় মূল বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

একাধিক প্রশাসনিক সূত্র বলছে—বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চ পর্যায়ের সচিব কমিটি আরও দুই থেকে তিনটি সভা শেষে চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিতে পারে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে কবে নাগাদ বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তাদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গেলে আরও প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা বর্তমান রাজস্ব আয়ের প্রেক্ষাপটে কঠিন। এটি করতে গেলে তা বর্তমান ঘাটতি বাজেটে বিশাল চাপ তৈরি করবে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ তৈরি করবে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় দেশি বা বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে— নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশ চূড়ান্ত করা। নতুন কাঠামোর সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, গ্রেডের সংখ্যা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ভাতা ও পেনশনের প্রভাব বিবেচনা করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা অর্থ বিভাগের যাচাই এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পরই গেজেট বা বাস্তবায়ন প্রজ্ঞাপন জারির পথ খুলবে। অর্থাৎ পে-স্কেল কার্যকরের আগে এখনো একাধিক প্রশাসনিক ও নীতিগত ধাপ বাকি। সরকারের জন্য সবচে বড় বিবেচনার বিষয় হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতা। মূল বেতন বাড়লে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ব্যয় নয়, বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, গ্র্যাচুইটি, অবসর-সুবিধা ও পেনশনের ব্যয়ও বাড়বে। সরকারের বিবেচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য পথ হলো, প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা পরে সমন্বয় করা।

প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে—নতুন পে-স্কেল নিয়ে কর্মরতদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কতটা সমন্বয় হবে, সর্বনিম্ন পেনশন বাড়বে কিনা এবং পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধার ব্যবধান কীভাবে নির্ধারিত হবে, এসব বিষয়ও চূড়ান্ত প্রস্তাবের অংশ হওয়ার কথা। তবে অর্থ বিভাগ এখনো কোনো নির্দিষ্ট হার বা সূত্র প্রকাশ করেনি। নতুন কাঠামো কার্যকরের আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের সুবিধা সমন্বয়ের স্পষ্ট পদ্ধতি না থাকলে বৈষম্যের অভিযোগও উঠতে পারে। পে-স্কেল বাস্তবায়ন বড় ধরনের প্রযুক্তিগত কাজও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্তন, ভাতা, আয়কর ও পেনশনের হিসাব বর্তমানে সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থা বা আইবিএএস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন গ্রেড ও মূল বেতন কার্যকর করতে সফটওয়্যারে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান বেতন নতুন কাঠামো কোন ধাপে নির্ধারিত হবে, সেটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সার্ভিস রেকর্ড, পদ, গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টের তথ্য হালনাগাদ না থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনো আইবিএএস সার্কুলার বা সরকারি নির্দেশনা প্রকাশ হয়নি। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি কমিশনের সুপারিশ এবং অষ্টম বেতন কাঠামোর ত্রুটিগুলো নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে। কমিটি আরও দুই থেকে তিনটি কারিগরি বিশ্লেষণমূলক সভার পর তাদের খসড়া মন্ত্রিসভায় পাঠাবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হতে পারে। সূত্র জানায়, গেজেট প্রকাশে কিছুটা দেরি হলেও বর্ধিত বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই কার্যকর ধরা হবে এবং চাকরিজীবীরা বকেয়াসহ তা পাবেন।

Share