আসছে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট!

গাজী আবু বকর : চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি নিয়ে আগামী বাজেটের আকার ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশী করার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যা আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করবেন চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নির্বাচিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যিনি ২০০১ সালে জোট সরকারের আমলে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।

স্বাধীনতার পর থেকে এযাবৎকালের বাজেট সমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সাধারণত চলমান বাজেটের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেশি বরাদ্দ রেখে পরবর্তী বাজেট ঘোষণা করা হয়। এই রীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন সরকার প্রতি বছর জাতীয় বাজেট দিয়ে আসছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময়ের এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ চলতি অর্থবছরে একটি ব্যতিক্রমী বাজেট দেন। যেটি আগের অর্থবছরের চেয়ে আকারে ছোট ও ব্যয় সংকোচনমুখী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটের অর্ধেক বাস্তবায়ন করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাকি অর্ধেক করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার। এরই মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

বর্তমানে যেখানে বৈদেশিক সহায়তার গতি ধীর। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বেড়েছে জ্বালানি খাতে ব্যয়ের চাপ। রয়েছে সার-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির চাপ। এ ছাড়া রয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও নির্বাচনী ওয়াদা পুরণের চাপ। সবকিছু মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ বাড়লেও বাড়েনি প্রত্যাশিত আয়। এমন সংকটকালে ধারণা করা হয়েছিল, নতুন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘ব্যয় সংকোচনমুখী’ একটি ছোট বাজেট দেবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যিনি একই সঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী, আগের পথে না হেঁটে বড় বাজেটের দিকে ঝুঁকছেন। নতুন বাজেটে বিশাল ঘাটতি রেখে বড় আকারের ব্যয়ের পরিকল্পনা করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিতে শুক্রবার মধ্য রাতে ঢাকা ছেড়েছেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম বৈঠক করেন তিনি। এ বৈঠকে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঝুঁকি চিহ্নিত করা ও তা মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রূপরেখা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়। জানা গেছে, বৈঠকে আগামী অর্থবছরের জন্য ৫ শতাংশ ঘাটতি ধরে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা। তাতে সম্মতি দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আরও আলোচনা করে প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করতে হবে। ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে চাপ আছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ অত্যধিক বেড়েছে। এসব কারণে সরকারি ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। এই চাপ সামলাতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এ জন্য আরও বেশি রাজস্ব আহরণে এনবিআর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুরণের চাপ আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে ভতুর্কি বেড়েছে। রাজস্ব আহরণে বিশাল ঘাটতি আছে। তা ছাড়া নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা বেশি থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। এসব মাথায় রেখে আগামী বাজেটে বড় আকারের ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে প্রধানত চারটি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও জ্বালানি সংকটের সমাধান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় আগামী বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। কারণ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি অত্যন্ত গভীর সংকটকালের প্রেক্ষাপটে পেশ করা হচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে জ্বালানি সমস্যা ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিপুল ঋণের বোঝা, ভর্তুকির চাপ ও সম্পদের ঘাটতি সত্ত্বেও ব্যয়ের উর্ধ্বমুখিতার মতো সমস্যা বিদ্যমান। এমন এক ভঙ্গুর ও নাজুক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই বাজেট প্রণীত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায়, সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে বাজেটের আকার অতিরিক্ত বড় করা যেমন বাঞ্ছনীয় হবে না, আবার এটি অতিমাত্রায় রক্ষণশীলও হওয়া উচিত নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে হতে হবে ‘ভারসাম্যমূলক ও বাস্তবায়নযোগ্য’। বড় বাজেটের দিকে নজর বেশি না দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ও গুণগত মানসম্পন্ন বাজেট করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকতে হবে। তা হলে এর সুফল সবাই পাবে। আর ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাজেট হতে হবে কর্মসংস্থানমুখী। জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান চান তারা। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আগামী বাজেট সাজানো হচ্ছে। পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাবরের মতো গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব থাকছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রাক্কলন করা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ। চলতি বাজেট ঘোষণার সময় জিডিপির লক্ষ্য ধরা হয় সাড়ে ৫ শতাংশ। পরে সংশোধন করে তা নির্ধারণ করা হয় ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ আপডেট প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। তা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

Share